মোদি- শি আলোচনা; উন্নয়নী অংশীদারিত্বে দুই নেতার অঙ্গীকার
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের রাষ্ট্রপতি শি-চিন- ফিং’এর মধ্যে তামিলনাডুর মামাল্লাপূরমে আলোচনা সম্পন্ন হল। উভয় নেতা, তাঁদের মধ্যে এই দ্বিতীয় অ-আনুষ্ঠানিক আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বহু বিষয়ে খোলাখুলি কথা বললেন। বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলেছে, তার প্রেক্ষিতে এই আলোচনা, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিধি সম্প্রসারিত ক’রে এই সম্পর্কে অধিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আসবে বলেই বিভিন্ন মহল মনে করছেন।
এশিয়ার দুটি শক্তিধর দেশের এই দুই নেতা - মোদি ও শি-চিন ফিং’এর মধ্যে এই বৈঠকের প্রথম দিনের আলোচনায় যে সব বিষয় প্রাধান্য পায়, সেগুলির মধ্যে ছিল দুটি দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক, যুগ প্রাচীন বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন, সন্ত্রাসবাদের বিপদ ও জাতীয় নিরাপত্তার মত বিষয়। দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় প্রধানত দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন বিষয়, যেমন সীমান্তে স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জন সম্পর্ক প্রসঙ্গ নিয়ে দুই নেতার মধ্যে কথা হয়।
দুই নেতার আচরণে আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগত হৃদ্যতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। সে কারণেই দুটি দেশের মধ্যে বিবাদমূলক বিষয়ে পারস্পরিক উদ্বেগকে অনুধাবন ক’রে তাঁরা খোলাখুলি আলোচনা করতে পারলেন। বৈঠকের অবসরে মামাল্লাপুরম মন্দির পরিসর ভ্রমণের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদি, দক্ষিণ ভারতে পল্লব বংশের রাজত্বকাল থেকে ভারত ও চীনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যক সম্পর্কের কথা ব্যাখ্যা করেন, যা চীনা রাষ্ট্রপতিকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি পেইচিং “এশীয় সভ্যতা বার্তালাপ” শীর্ষক একটি আলোচনাচক্র আয়োজন করে। তাতে ভারত অংশ না নিলেও দুটি দেশে তার ইতিবাচক কিছু প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে সাংবাদিকদের পষ্ট জানিয়েছেন, দুই নেতার মধ্যে পারস্পরিক উদ্বেগের একাধিক বিষয়ে কথা হলেও কাশ্মীর প্রসঙ্গ নিয়ে কোনও আলোচনা হয় নি। এ ছাড়াও নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত বিদেশ মন্ত্রীদের চতুর্পাক্ষিক নিরাপত্তা বার্তালাপ প্রসঙ্গটিও এই আলোচনায় চীনা রাষ্ট্রপতি উত্থাপন করেন নি। তবে বর্তমানে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য লড়াই ও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও চীনা রাষ্ট্রপতি শি পারস্পরিক স্বার্থেই একযোগে কাজ করে যেতে সম্মতি ব্যক্ত করেছেন।
পররাষ্ট্রসচিব বিজয় গোখলে জানিয়েছেন, দুই নেতার মধ্যে বৈঠকে ১৭ টি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। চীনের ইউহানে দুই নেতার মধ্যে প্রথম অ-আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মাত্র পাঁচটি বিষয় নিয়ে কথা হয়। এগুলি ছিল- কৌশলগত যোগাযোগ, সীমান্তে স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য বৈষম্য, আফগানিস্তানে যৌথ উন্নয়নী প্রকল্প ও দুটি দেশের মধ্যে জন সম্পর্ক। মামাল্লাপূরম বৈঠকেও ওই পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে আফগানিস্তান প্রসঙ্গ বাদে বাকি চারটি বিষয়ের ওপর আবার জোর দেওয়া হয়। দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিবাদমূলক বিষয়ের নিষ্পত্তির লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ ও চীনের উপ প্রধানমন্ত্রী হু-শুন হুয়া’র সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠনের দিশায় বৈঠকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
মামাল্লাপূরম আলোচনায় উভয় নেতা দুটি দেশের মধ্যে জন সম্পর্ক বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। গত ডিসেম্বর মাসে চীনা বিদেশমন্ত্রীর নতুন দিল্লি সফরে দশটি ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতামূলক “দশটি স্তম্ভ” শীর্ষক একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়; যেগুলির মধ্যে আছে- পর্যটন, যুব বিনিময়, সংবাদ মাধ্যম, সংগ্রহালয় ব্যবস্থাপনা, নীতি প্রণয়ন স্তরে মঞ্চ গঠন ও চীনা ভাষার শিক্ষক সহায়তা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয় শঙ্কর’এর এ বছর আগস্টে পেইচিং সফরে এসব বিষয়ে সহযোগিতা এক নতুন মাত্রা পায়। পর্যটন ক্ষেত্রের উন্নতির লক্ষ্যে মাত্র কয়েকদিন আগেই নতুন দিল্লি চীনা নাগরিকদের জন্য ই-ভিসা প্রণালীর সরলীকরণ করেছে।
মামাল্লাপূরম আলোচনায়, তামিল নাড়ু ও চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সংকল্প ব্যক্ত করা হয়। এ ছাড়া, দুটি দেশের মধ্যে যুগ প্রাচীন নৌ যোগাযোগ অধ্যয়নের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
উল্লেখ করা যেতে পারে, রাষ্ট্র নেতাদের মধ্যে ঘরোয়ে বৈঠকে সাধারণত কোনও স্পষ্ট পরিণাম আশা করা যায় না। তবে প্রাধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনা রাষ্ট্রপতি শি-চিং-ফিং’এর মধ্যে এক বছরের ব্যবধানে আয়োজিত দুটি ঘরোয়া বৈঠকে অত্যন্ত ইতিবাচক কিছু ফল পাওয়া গেছে। এই দুটি বৈঠক দ্বিপাক্ষিক আলাপ আলোচনা অব্যাহত রাখার ও পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত করার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপুর্ণ অবদান যোগাবে।
দুই নেতা এই ধরণের আলোচনা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছেন। এরই অঙ্গ হিসেবে চীনা রাষ্ট্রপতি তৃতীয় অ-আনুষ্ঠানিক বৈঠকের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তাঁর দেশে যাবার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। শ্রী মোদি তা গ্রহণ করেছেন। ( মূল রচনা শ্রীকান্ত কোন্ডাপল্লী)
নিয়েও দুই নেতার মধ্যে কথা বিষয়ক
সামগ্রিক বিচারে এই বৈঠক বিশেষ ফলপ্রসূ হয়েছে
Comments
Post a Comment