ভারত-চীন উচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক আলোচনা ব্যবস্থা

মামালাপুরমে প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এর মধ্যে ঘরোয়া শিখর বৈঠকের উল্লেখযোগ্য একটি সিদ্ধান্ত হল উচ্চ পর্যায়ের অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক আলোচনা ব্যবস্থা শুরু করা। সীমান্ত প্রশ্নের মোকাবিলায় ভারত ও চীনের মধ্যে বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগের অনুরূপ এই সিদ্ধান্ত। ভারতীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ এবং চীনের উপ-প্রধানমন্ত্রী হু চুন হুহা এই ব্যবস্থার সহ-সভাপতিত্ব করবেন।

সর্বোচ্চ নেতৃত্বের স্তরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গভীর করার লক্ষ্যে এই ঘরোয়া শিখর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই ব্যবস্থাপনা সৃষ্টি থেকে বোঝা যায় যে দুটি দেশ জরুরী বিষয়গুলির মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে; কারণ বাণিজ্য ঘাটতি পেইচিং এর অনুকূলে ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ব্যবস্থাপনার বিস্তারিত জানানো হয় নি, তবে স্বভাবতই যে প্রশ্নটি মাথায় আসে তা হল ভারতীয় শিল্প কি এই অভিমত এগিয়ে নিয়ে যাবার সুযোগ পাবে।

দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্য কারণ হল বিশ্ব বাণিজ্য সংগঠনের মত বহুপাক্ষিক মঞ্চ এই ধরণের সমস্যার মোকাবিলায় সক্ষম নয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিবাদ নিস্পত্তি প্যানেলে বর্তমানে তিনজন বিচারপতি রয়েছেন, কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য এটাই সর্বনিম্ন সংখ্যা। তবে, দুজন বিচারপতি ২০১৯এর ডিসেম্বরে অবসর নেবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রকের সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির ভারত-চীন বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ের এক রিপোর্টে দেখা গেছে বাণিজ্য ঘাটতি ভারতের প্রতিকূলে; যার পরিমাণ ৫৬ বিলিয়ন ডলারের অধিক এবং ভাতীয় পণ্য ও পরিষেবা চীনের নন-ট্যারিফ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখিন। এছাড়া, সস্তা পণ্য বোঝাই করা এবং চীনের পক্ষে উপযুক্ত বিনিয়োগের অভাব বাণিজ্য সম্পর্কে সমস্যার সৃষ্টি করেছে। চীনের ডিজিটাল সিল্ক রোডের বিষয়ে সাম্প্রতিক এক সম্মেলনে প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে যে হুয়াওয়েই এবং ZTEর টেলিকমিউনিকেশন ক্ষেত্রের বাজারে ৪২ শতাংশ অংশিদারিত্ব রয়েছে এবং ভারতে চীনের ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন শেয়ারের পরিমাণ ৬৬ শতাংশ। নতুন দিল্লীর চাইনিজ গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই সমীক্ষা চালায়।

এই ব্যবস্থাপনার বিস্তারিত জানানো হলে বোঝা যাবে আঞ্চলিক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব RCEPর সঙ্গে তা কিভাবে সামঞ্জস্য বিধান করে। বর্তমানে সেটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ভারতীয় বাজারে চীনা পণ্যের আধিক্য, প্রযুক্তি হস্তান্তর ব্যতিরেকে বিনিয়োগ এবং ই-কমার্সের জন্য ডাটা লোকালাইজেশনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে ভারত উদ্বিগ্ন। ভারতীয় তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে চীনের বড় রকমের উপস্থিতি রয়েছে।

সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় জাপানের সঙ্গে অনুরূপ ব্যবস্থাপনা গঠনে তেমন কোনো সুফল পাওয়া যায় নি, সে কথা অবিদিত নয়। ২০১৪ সালে ভারত সরকারের বাণিজ্য এবং শিল্প মন্ত্রকের শিল্প নীতি এবং উন্নয়ন বিভাগ, সুফল লাভের আশায় জাপান থেকে দ্রুত বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য জাপান প্লাস নামে একটি বিশেষ ম্যানেজমেন্ট দল গঠন করে। তখন থেকেই এর অগ্রগতি খুব মন্থর। প্রস্তাবিত চেন্নাই-বেঙ্গালুরু শিল্প করিডোর এখনও বিকাশের স্তরে রয়েছে এবং ভারতের ৯টি রাজ্যে ১২ জাপান শিল্প নগরী প্রকল্পে সামান্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে।

এই দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থাপনাকে এই ধরণের উদ্বেগের নিরসন করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যেকার সমস্যাও ঠিক একই ধরণের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন দুজনেই শক্তিশালী এবং সামান্য ক্ষতি তারা বরদাস্ত করতে সক্ষম। ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে কিছুটা প্রভাব গড়ে তুলতে হবে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থাপনায় পরিষেবা এবং ফার্মাসিউটিক্যাল ক্ষেত্র থেকে কিছু ভারতীয় কোম্পানীর অন্তর্ভুক্তি পেইচিং এর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভারতের জন্য অনুকূল পরিস্তিতি তৈরি করতে পারে। ভারতের বাণিজ্য উদ্বেগ নিরসনে যে কোনো রকম অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্য আলোচনা ব্যবস্থাপনা উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। আরো দেখার বিষয় হল প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থাপনা বর্তমান সমস্যার সমাধান করতে এবং অর্থনীতির নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনে সঠিক দিশা দেখাতে কতটা সক্ষম। (মুল রচনাঃ ড.রাজদীপ পাকানাতি)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?