তুরস্কের সিরিয়া আক্রমণে আন্তর্জাতিক অসন্তোষের ইঙ্গিত ট্রাম্পের

তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত উত্তাল মধ্য প্রাচ্যকে কাঁপিয়ে তুলেছে। সিরিয়া থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের কিছুদিন পর উত্তর সিরিয়ায় আক্রমণের বিষয়ে তুরস্কের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মার্কিন রাষ্ট্রপতি তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। কুর্দিশ-প্রাধান্য বিশিষ্ট সিরিয়ান ডেমক্রেটিক ফোর্স এস ডি এফ ব্যতিরেকে বাফার জোন সৃষ্টি করাই এর লক্ষ্য। তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসে তাঈপ এর্ডোগান এস ডি এফকে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী হিসেবে দেখে, কারণ সেদেশের কুর্দিশ ওয়ার্কার পার্টি পি কে কের সঙ্গে তাঁদের যোগসাজস রয়েছে। সিরিয়ার কুর্দদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে তিনি তুরস্কের অভ্যন্তরে কুর্দিশ নাগরিকদের প্রভাব সীমিত রাখার চেষ্টা করছেন।

অন্যরা যাতে পরিস্থিতির সুরাহা করতে এগিয়ে আসতে পারে সেই অজুহাতে সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যারের বিষয়ে ট্রাম্পের আচমকা সিদ্ধান্তকে সিরিয়া এবং ইরাকে কুর্দদের প্রতি বিশ্বাস ঘাতকতা বলে মনে করা হচ্ছে। আই এস আই এস এর সামরিকভাবে পরাজয়ের পেছনে এরাই ছিল বড় শক্তি। ২০১৯ এর মার্চে চরম পন্থি সিরিয়া আই এস আই এস এর সম্পূর্ণ পরাজয় বলে ঘোষণা করা হয়। আশংকা করা হচ্ছে যে অবশিষ্ট চরমপন্থিরা আবার সংগঠিত হতে পারে।

গত সপ্তাহে তুরস্ক উত্তর পশ্চিম সিরিয়ায় ব্যপকভাবে সামরিক হানা দেয়। রাষ্ট্রপতি এর্ডোগান তাঁর দেশের ৩.৬ মিলিয়ন সিরিয় শরনার্থীর বসতি গড়ার জন্য সিরিয়ার ৩০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে একটি নিরাপদ অঞ্চল চাইছে। শরনার্থীদের পুনর্বাসন নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ, তবে তুরস্কের এই পদক্ষেপ বিতর্কিত এবং বিশ্ব জুড়ে এই পদক্ষেপের নিন্দা করা হয়েছে।

তুরস্কের আক্রমণের বিষয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প সেদেশের বিরুদ্ধে একাধিক শাস্তি ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করেছেন। উল্লেখ্য তুরস্ক NATOর সদস্য। এই সব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে তুরস্কের ইস্পাত আমদানির ওপর পুনরায় ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ এবং ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত রাখা। মার্কিন বিচার বিভাগ শীর্ষ স্থানীয় টার্কিশ ব্যাংক হাল্কব্যাংকের বিরুদ্ধে ফৌজদারী তদন্তের কথা ঘোষণা করেছে। এদের বিরুদ্ধে মূল্য অভিযোগ হল টাকার কালো বাজারী। ট্রাম্প প্রশাসন তুরস্কের প্রতিরক্ষা, শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ মন্ত্রককে নিষিদ্ধি করেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে এবং তাদের লেনদেন নিষিদ্ধ করেছে।

রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে তুরস্কের নেতারা যদি এই বিপজ্জনক এবং ধ্বংসাত্মক পথে চলতে থাকে তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেবে। মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি মধ্য প্রাচ্যে যাচ্ছেন। তিনি সতর্ক করে দেন যে তুরস্ক অবিলম্বে যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা না করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। মার্কিন আইন প্রণেতারাও আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করেছেন।

সিরিয়ার ওপর আক্রমণ চালিয়ে রাষ্ট্রপতি এর্ডোগান অনেককেই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের ইরান নীতিতে ক্রুদ্ধ ইওরোপীয় ইউনিয়ন আংকারার বিরুদ্ধে শাস্তি ব্যবস্থা আরোপে খুশী হয়েছে। তারা কুর্দদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করবে এবং আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবে। শরনার্থী সংকট ব্রাসেলসের ক্ষমতা সীমিত করে দিচ্ছে কারণ রাষ্ট্রপতি এর্ডোগান তুরস্কের সীমান্ত খুলে দেওয়ার এবং ইওরোপীয় দেশগুলিতে বিপুল সংখ্যায় শরনার্থী পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের কঠোর ব্যবস্থা সিরিয়া এবং তাদের কৌশলগত অংশীদার রাশিয়ার কাছে উপভোগ্য। তারা তুরস্কের আক্রমণের উপযুক্ত জবাব দিতে অক্ষম। তবে, তারা সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি বাশার আল আসাদের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়েরও বিরোধী। সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি বাশার আল আসাদের বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে বিরোধিতাকারী এস ডি এফ ইতিমধ্যেই তুরস্কের গৃহীত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ বিরতি চুক্তিতে পৌঁছেছে।

রাষ্ট্রপতি এর্ডোগান লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। কিছু সামরিক লাভ ব্যতিরেকে তিনি এই অবস্থা থেকে ফিরে আসতেও পারবেন না। ইরাণ, জেরুজালেম বা গোলান হাইট সংক্রান্ত তাঁর নীতি বিতর্কিত এবং একেবারেই জনপ্রিয় নয়। তবে তুরস্কের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের প্রতি অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন রয়েছে।

সেই কারণেই, তুরস্কের অভ্যন্তরীণ দ্বিদলীয় সমর্থন এবং আঞ্চলিক একাকীত্বের ফলে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প আগামী দিনগুলিতে আংকারার বিরুদ্ধে তাঁর শাস্তি ব্যবস্থা আরো প্রসারিত করতে সক্ষম হবে বলে মনে হয়।

উত্তর পূর্ব সিরিয়ায় তুরস্কের এক তরফা সামরিক আক্রমণে ভারত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। নতুন দিল্লি বলেছে তুরস্কের এই পদক্ষেপের ফলে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া তাদের এই ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে অসামরিক এবং মানবিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনাও প্রবল। (মূল রচনাঃ অধ্যাপক পি আর কুমারস্বামী)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?