দক্ষিন চীন সমুদ্রঃ এক নতুন সম্ভাব্য সীমান্ত

অভিযোগ রয়েছে দক্ষিণ চীন সমুদ্রে চীন লাল সীমান্ত রেখা অতিক্রম করেছে এবং ভীয়েতনামের একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল ই ই জেড-এ অনধিকার প্রবেশ করে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘণ করেছে। অভিযোগ হল যে চীনের সমীক্ষা জাহাজ ভীয়েতনামের নিকটতম ক্ষেত্র ৬০ নটিকাল মাইলের মধ্যে পৌঁছে গেছে। ফলে, চীনের সঙ্গে ব্যাপক মতপার্থক্যে জড়িয়ে পড়া দেশ ভীয়েতনামের অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় আশংকা দেখা দিয়েছে এবং অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। 

আরো অভিযোগ, চীনের জাহাজ কমপক্ষে চারটি অন্য জাহাজের নিরাপত্তা বেষ্ঠন নিয়ে ভীয়েতনামের ই ই জেড-এর সমীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে এবং দক্ষিণ ভীয়েতনামের ফু কুয়ে দ্বীপের ১০২ এবং দক্ষিণ ভীয়েতনামের ফান থিয়েট শহরের সমুদ্র সৈকত থেকে ১৮৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে।

উল্লেখ্য, কোনো দেশের ই ই জেড সীমানা সাধারণত উপকূল রেখা থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ঐ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সার্বভৌম অধিকার সংশ্লিষ্ট দেশের হাতে ন্যস্ত রয়েছে। যারা দক্ষিণ চীন সমুদ্রে শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায় তাদের চীনকে বলা উচিত অবিলম্বে অন্যান্য সমস্ত জাহাজ সহ তাদের সমীক্ষা জাহাজ সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক। 

ভীয়েতনামের উপকূল রেখার খুব কাছেই এই সব জাহাজের উপস্থিতি, ফলে হ্যানয়ের সামুদ্রিক ক্ষমতার ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক। তাছাড়া এর ফলে ভীয়েতনামের গ্যাস এবং তেল অনুসন্ধানের কাজেও বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। রুশের পেট্রোলিয়াম সংস্থা রোজনেফটের অংশীদারিত্বে এই অনুসন্ধা কার্য চলছে। চীন এবং ভীয়েতনামের মধ্যে জ্বালানী-সমৃদ্ধ সমুদ্রাঞ্চল নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে বিবাদ রয়েছে, তবে ভীয়েতনামের ই ই জেড এ পেইচিং এর অতিক্রমণ সম্প্রতি সেই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে একাধিপত্য স্থাপনের বিষয়ে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এর স্বপ্ন পূরণ হতে পারে এবং কমিউনিস্ট সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ৭০বছর উদযাপনের সময় একই ঘটনার তাৎপর্য অনস্বীকার্য। 

অতীতে চীনের আচরণে সংযম আনার একাধিক প্রয়াস চালানো হয়েছে এবং এই সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা এখনও অব্যাহত রয়েছে। তবে এপর্যন্ত কোনো ব্যবস্থাই সফল হয় নি। তাই শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দায়িত্ব এখন দক্ষিণ পূর্ব এশিয় দেশগুলির সংগঠন আসিয়ানকেই নিতে হবে এবং দক্ষিণ চীন সমুদ্রের দন্দ্বের মোকাবিলায় উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 

২০১৯এর জুন মাসে আসিয়ান বিদেশ মন্ত্রীদের বৈঠকের সময় দক্ষিণ চীন সমুদ্রে পেইচিং এর কার্যকলাপে বিষয়ে চেয়ারম্যানের বিবৃতিতে উদ্বেগ লক্ষ্য করা যায়। ব্যাংককে অনুষ্ঠিতব্য তাদের আসন্ন শিখর বৈঠকে চীনকে সংযত করার জন্য এই সংগঠনকে অধিকতর ঐক্যবদ্ধ হতে হবে নচেৎ এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হবার বিপদ রয়েছে। 

দক্ষিণ চীন সমুদ্রে ভারতের অবস্থান সামুদ্রিক নিয়ম সংক্রান্ত রাষ্ট্রসংঘ চুক্তির ওপর ভিত্তি করে গৃহীত। ভারত মনে করে দক্ষিণ চীন সমুদ্রে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের ক্ষতি করতে পারে। দক্ষিণ চীন সমুদ্র একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ যার মধ্য দিয়ে বছরে ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্যিক কাজকর্ম সাধিত হয়। মালাক্কা প্রণালী চীন সমুদ্রের সঙ্গে ভারত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে, এখানে সুয়েজ ক্যানেলের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি পরিমানে তেল আনা নেওয়া হয়ে থাকে। 



প্রধানমন্ত্রী মোদির পূবে কাজ করার নীতির আওতায় এই অঞ্চলের সঙ্গে, বিশেষ করে, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভীয়েতনাম এবং ফিলিপিন্সের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক গভীরতর হয়েছে। তাই পূর্ব এশিয় শিখর বৈঠকের সময় পূর্ব এশিয়া এবং আসিয়ান দেশ সমূহের নেতৃত্ব দক্ষিণ চীন সমুদ্র নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করবে তা আশা করা যেতেই পারে। ভারত নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিয়ম ভিত্তিক সামুদ্রিক শৃংখলা এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিবাদ নিস্পত্তির বিষয়ে তাদের অবস্থানের প্রতি পুনরায় জোর দেবে এটাই স্বাভাবিক। ( অধ্যাপক বালাদাস ঘোষাল)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?