চ্যান্সেলর মার্কেল’এর নতুন দিল্লি সফরে ভারত- জার্মানি সম্পর্ক মজবুত হবে
জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাংগেলা মার্কেল, তাঁর মন্ত্রী সভার ১২ জন সদস্য ও একটি উচ্চ স্তরীয় ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দল সহ ভারত সফরে এসেছেন।
অ্যাংগেলা মার্কেল ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর যুগ্ম পৌরোহিত্যে পঞ্চম আন্তঃসরকারী আলোচনা-IGC বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। ভারত নির্বাচিত কয়েকটি দেশের অন্যতম, যার সঙ্গে জার্মানির এই ধরণের উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা হয়ে থাকে। ইতিমধ্যে অ্যাংগেলা মার্কেল, রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। দুই নেতার মধ্যে বৈঠকে রাষ্ট্রপতি, জার্মানির সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ ক’রে বলেন, ইউরোপীয় সঙ্ঘ-EU ও ভারতের মধ্যে একটি সুষম ও সর্বাত্মক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি সম্পাদনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে জার্মানির সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। EU-ভুক্ত দেশগুলির মধ্যে জার্মানিই হল ভারতের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার দেশ। জার্মান চ্যান্সেলরের সঙ্গে আলোচনায় রাম নাথ কোবিন্দ, একটি বহু পাক্ষিক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ও সন্ত্রাস দমনে সহযোগিতা শক্তিশালী করতে দুটি দেশের একযোগে কাজ করে যাওয়ার গুরুত্বের কথা বলেন। শ্রী কোবিন্দ, আর্থিক ব্যবস্থা গ্রহণ সংক্রান্ত টাস্ক ফোর্স-FATF’এর বৈঠকে পারস্পরিক সহযোগিতার ওপরেও জোর দেন।
ভারত-জার্মান কৌশলগত অংশীদারিত্ব যে গণতন্ত্র, অবাধ বাণিজ্য নীতি ও একটি শৃংখলাবদ্ধ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত তা IGC বৈঠকে অ্যাঙ্গেলা মার্কেল ও শ্রী মোদী স্মরণ করেন। শ্রী মোদী, জার্মান চ্যান্সেলরকে ভারতের একজন সুহৃদ হিসেবে উল্লেখ করেন ও বলেন, গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত দীর্ঘ দিন ক্ষমতাসীন একজন নেতা হিসেবে অ্যাঙ্গেলা মার্কেল বিশ্ব সম্প্রদায়ের অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুটি দেশের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিয়মিত যে সব চুক্তি হচ্ছে, সেগুলি পারস্পরিক আস্থা ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেরই পরিচয় বহন করছে। দু বছর আগে রচিত যৌথ কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি পর্যালোচনা করার পর সামগ্রিক ভাবে চারটি শ্রেণির আওতায় মোট ১১ টি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। এই চারটি শ্রেণি হল- কৃত্রিম মেধা ও ডিজিটাল রূপান্তরণ কর্মসুচি ক্ষেত্রে সহযোগিতা ; উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিধির বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, ধারাবাহিক উন্নয়নের স্বার্থে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের আদর্শ মজবুত করা ও জন সম্পর্ক বৃদ্ধি। IGC বৈঠক শেষে জারি করা যৌথ বিবৃতিতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশিদারিত্বের ৭৩ দফার একটি নথি প্রকাশ করা হয়।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রে দুই নেতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংগঠন- WTO’কে একটি নিয়মানুগ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করেন। বৈঠকে, মেক ইন ইন্ডিয়া ও ভারত-জার্মান স্টার্ট-আপ বিনিময় কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়া হয়। দুই নেতা, ব্যয় সাশ্রয়ী পুনর্ব্যবহারযোগ্য তেজঃশক্তি ও ই-মোবিলিটির মত নতুন ও উদ্ভাবনীমূলক ক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনের কথা বলেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থে ভারত ও জার্মানির অর্থমন্ত্রকের প্রবীণ আধিকারিকদের মধ্যে আলোচনা মঞ্চটি আবার সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়; যার অধীনে ভারতে উচ্চগতি সম্পন্ন রেল প্রকল্প, অসামরিক বিমান চলাচল ও বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকাঠামো উন্নয়নের মত বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনা ও তথ্য বিনিময় সম্ভব হবে।
জলবায়ূ পরিবর্তন জনিত চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় ধারাবাহিক উন্নয়নী লক্ষমাত্রা ও প্যারিস চুক্তি দুটি দেশের কাজকর্মের একটি অভিন্ন ভিত্তি। তেজঃশক্তি ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হল ভারত-জার্মান তেজঃশক্তি মঞ্চ, ২০১৫’র ভারত-জার্মান সৌর অংশীদারিত্ব, ও ২০১৩’র নির্মল জ্বালানী করিডোর বিষয়ক সহযোগিতা। এ ছাড়া জন সম্পর্ক ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষা বিষয়ক ভারত-জার্মান অংশীদারিত্ব ও ভারত-জার্মান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কেন্দ্র বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
২০২০’তে ভারত-জার্মান কৌশলগত অংশীদারিত্বের ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। নিরাপত্তা ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুটি দেশের বিদেশ সচিব স্তরে ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী স্তরে প্রতি বছর আলাপ আলোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দুটি দেশ, আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনের ওপর জোর দিয়েছে ও ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি অনুমোদন করেছে। পরিশেষে, জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের বর্তমান ভারত সফরে দুটি দেশ, বিশ্ব শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পূর্ব শর্ত হিসেবে একটি বলিষ্ঠ বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পক্ষে আবার জরালো সওয়াল করেছেন। (মূল রচনাঃ- উম্মু সালমা বাভা)
Comments
Post a Comment