পাকিস্তানের চিরাচরিত রাজনীতি

পাকিস্তান কোনোভাবেই স্বীকার করে নিতে পারছে না যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কাশ্মীর প্রসঙ্গটি একেবারেই গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। ভারতের পূর্বতন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা বিলোপের পর থেকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের ভরপুর প্রয়াস চালায়। তবে, ভারত সাফল্যের সঙ্গে বিশ্ববাসীর কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে যে নতুন দিল্লি সংবিধান অনুযায়ী কাজ করেছে এবং এই পরিবর্তন ভারতের সার্বভৌমত্বের এক্তিয়ারের মধ্যেই করা হয়েছে। 

এখন ইসলামাবাদ বুঝতে পারছে যে তারা ক্রমশঃ একা হয়ে পড়ছে, তাই রাজনীতিবিদরা কাশ্মীর নিয়ে রাজনীতি করছে এবং সরকারের আর দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। কাশ্মীর বিষয়ক এবং গিলগিট ও বাল্টিস্তান সংক্রান্ত মন্ত্রী আলি আমিন গান্ডাপুর কাশ্মীর বিষয়ে যে সব দেশ ভারতের পক্ষ নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের হুমকি দিয়েছেন। 

স্থানীয় একটি পাকিস্তানী টেলিভিসন চ্যানেলের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে গান্ডাপুর বলেন, কাশ্মীর নিয়ে যদি ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ে, পাকিস্তান যুদ্ধে নামতে বাধ্য হবে এবং কাশ্মীর প্রসঙ্গে যারা ভারতের পক্ষ নিয়েছে পরিণতি তাদের ভুগতে হবে। কাশ্মীর প্রশ্নে যে দেশ ভারতের পক্ষ নেবে তাদের পাকিস্তানের শত্রু বলে বিবেচনা করা হবে এবং সেই দেশের বিরুদ্ধে ক্ষেপনাস্ত্র দিয়ে আক্রমণ চালানো হবে। গান্ডাপুর পাকিস্তানের রেল মন্ত্রী শেখ রশিদ গোষ্ঠীর রাজনৈতিক নেতা যিনি এই ধরণের মন্তব্যের জন্য পরিচিত। 

এটা খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয় যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী উঁচু পদে এই ধরণের লোকেদের মনোনীত করেছেন। গান্ডাপুর এবং রশিদের মত লোকেদের জন্য ‘নয়া পাকিস্তান’ এর স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। 

বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সংকটের জন্য পাকিস্তানের পরিস্থিতি ক্রমশঃ উত্তাল হয়ে উঠছে অথচ ইমরান সরকার ভারত-বিরোধী ভাবাবেগকে কাজ লাগাতে চাইছে। গত তিন মাস ধরে পাকিস্তান কূটনৈতিক চাল দেবার চেষ্টা করে চলেছে কিন্তু তাতে কোনো ফল হয় নি। 

এটি পরিস্কার যে কাশ্মীর প্রশ্নে ইমরান খান পিছিয়ে পড়েছে। পাকিস্তানের বিশ্লেষকগণ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পাকিস্তানের দৃষ্টিতে কাশ্মীর প্রশ্নটিকে দেখছে না। বিশ্বের নেতারা উন্নয়নের জন্য জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ নতুন এই কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল দুটি গঠনের ভারতীয় সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। কাশ্মীর উপত্যাকা, জম্মু ও লাদাখে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এই দুটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের জন্য ভারতের কাছে একাধিক উন্নয়নী পরিকল্পনা রয়েছে। এখানকার জনগণকে এই অঞ্চলের উন্নয়নের অংশীদার করা হবে। 

কাশ্মীর বিষয়ক পাকিস্তানী মন্ত্রী গান্ডাপুরকে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের উন্নয়ন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন। জনগণের জন্য লড়াই করতে পারলে তিনি খুশী হবেন। এই ধরণের জবাব মিথ্যাচার ছাড়া আর কি হতে পারে?

একদিকে পাকিস্তান সরকার কাশ্মীরের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে অন্যদিকে, জামায়েত-উলেমা-ইসলাম-ফজল পার্টির সভাপতি তথা দক্ষিণ পন্থি ধর্মীয় নেতা মৌলানা ফজল-উর-রহমানের ডাকে হাজার হাজার সরকার-বিরোধী বিক্ষোভকারী ইসলামাবাদে জমায়েত হয়ে দেশের ক্রমাবনত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পদত্যাগ দাবী করছে। 

ডিজেল কেলেংকারীতে অভিযুক্ত মৌলানা ডিজেল নামে পরিচিত মৌলানা ফজল উর রহমান করাচী থেকে এই পদযাত্রার নেতৃত্ব দেন। তিনি গুজরানওয়ালায় ভাষণ দিয়ে বলেন, সরকারকে জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে। তিনি আরো বলেন, ইমরান খান সরকার দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করেছে। 

দেশের প্রধান বিরোধী দল মুসলিম লিগ নওয়াজ পি এম এল এন এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টি পি পি পি ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরীক এ ইনসাফ পি টি আইএর বিরুদ্ধে জে ইউ আই এফ-এর প্রতিবাদ সমর্থন করছে। তারা গত বছরের বিতর্কিত যুক্তরাষ্ট্রীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়। 


এদিকে, খানের সরকার জে ইউ আই এফ এর যুবা ভলেন্টিয়ার শাখাকে জঙ্গী সংকগঠন আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করেছে। জে ইউ আই এফ আদালতে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। অনেক বিক্ষোভকারী ইসলামাবাদে জমায়েত হয়েছে এবং পরিস্থিতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। 

পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সিরিল আলমেইদা বলেছেন এই পদযাত্রা খান সরকারকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান সরকার অনভিজ্ঞ এবং রাজনৈতিক সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে তারা কতটা সক্ষম এবার সেটি পরীক্ষার সম্মুখিন হয়েছে। সরকারের অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার ফলে হিংসা সৃষ্টি হলে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। দুঃখের বিষয় এটাই হল পাকিস্তানের দুর্ভাগ্য। (মূল রচনাঃ কৌশিক রায়)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?