তাসখন্তে এস সি ও সরকার প্রধানদের বৈঠক

গত সপ্তাহান্তে উজবেকিস্তানের তাসখন্তে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এস সি ও পরিষদের সরকার প্রধানদের অষ্টাদশ বৈঠক হয়ে গেল। ভারত এই ইওরেশিয় সংগঠনে যোগ দেয় ২০১৭ সালে। এটি ছিল সরকার প্রধানদের বৈঠকে ভারতের তৃতীয়বার অংশ গ্রহণ। প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২০১৭র নভেম্বর-ডিসেম্বরে রাশিয়ার সোচিতে এবং ২০১৮র বৈঠক হয় তাজিকিস্তানের দুশানবেতে।

এস সি ওর মোট সদস্য সংখ্যা আট। এরা হল ভারত, কাজাকস্তান, চীন, কিরগিজস্তান, পাকিস্তান, রাশিয়া, তাজিকিস্তান এবং উজবেকিস্তান। এর চারজন পর্যবেক্ষক এবং ছ’জন আলোচনার অংশীদারও রয়েছে। সরকার প্রধানরা প্রতিবছর বৈঠকে মিলিত হয়। তাতে বার্ষিক বাজেট অনুমোদিত হয় এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং সংগঠনের অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা করা হয়। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য সহযোগিতার বিষয়গুলিও আলোচিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ দূত হিসেবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং তাসখন্তে সরকার প্রধানদের বৈঠকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। সন্ত্রাসবাদ এবং চরমপন্থা সমস্ত সদস্য দেশের জন্য এমনকি বিশ্বের জন্যও উদ্বেগের কারণ। শ্রী সিং সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় বর্তমান আন্তর্জাতিক আইন এবং ব্যবস্থাপনা মজবুত করা এবং রূপায়নের জন্য এস সি ওর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন সন্ত্রাসবাদ আমাদের সমাজের ক্ষতি করছে এবং আমাদের উন্নয়নী প্রয়াসকে বিঘ্নিত করছে। তাছাড়া সমগ্র বিশ্ব, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র, অনুন্নয়ন এবং অসাম্যের মত চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন।

এস সি ওর ব্যপক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ এদের কাছে রয়েছে বিশ্বের ৪২ শতাংশ জনসংখ্যা, মোট জি ডি পির প্রায় ২০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে এই সংগঠনভুক্ত দেশগুলি এবং এদের কাছেই রয়েছে ২২ শতাংশের বেশি ভুখন্ড। ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভারতে ব্যবসা বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি মেক ইন ইন্ডিয়া কর্মসূচির আওতায় যৌথ উদ্যোগে ভারতে বিনিয়োগের জন্য এস সি ও দেশসমূহকে আমন্ত্রণ জানান।

এস সি ওতে চীনের পর ভারত হল দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। মন্ত্রী বলেন, ভারত ক্ষমতা নির্মাণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারে। তাছাড়া কৃষি শিক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ, ওষুধপত্র, টেলিমেডিসিন, চিকিৎসা পর্যটন এবং আথিতেয়তা ও আর্থিক পরিষেবা ক্ষেত্রেও ভারতের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন বিশ্বায়ণ এস সি ও সদস্যদেশগুলির কাছে অপার সুযোগের পথ খুলে দিয়েছে। তবে, এর ফলে নানান চ্যালেঞ্জও দেখা দিয়েছে। একতরফা ব্যবস্থা এবং সংরক্ষণবাদের প্রবণতা বেড়েছে, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলিতে এর প্রাবল্য লক্ষ্য করা যায়। শ্রী রাজনাথ সিং বলেন, একতরফা নীতি এবং সংরক্ষণবাদ কখনও কারো ভালো করে নি। তিনি স্বচ্ছ, নিয়ম-ভিত্তিক, উন্মুক্ত এবং সর্বাত্মক ও বৈষম্যহীন বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সুপারিশ করেন যার কেন্দ্র স্থলে থাকবে বিশ্ব বাণিজ্য সংগটন। তিনি বলেন বিশ্ববাসীর উন্নততর জীবনের জন্য প্রয়োজন হল অর্থনৈতিক সহযোগিতা। অর্থনৈতিক বিকাশের লক্ষ্য হবে জনকল্যাণ। সমস্ত নীতির মূল লক্ষ্য সেটাই হওয়া উচিত বলে তিনি জানান।

সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং পরিবেশগত প্রভাবের শিকার হয় এস সি ও দেশগুলি। প্রধানমন্ত্রী মোদি ২০১৯এর ২৩শে সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রসংঘ জলবায়ু সংক্রান্ত কর্ম পরিকল্পনা শিখর বৈঠকে বিপর্যয় প্রতিরোধী পরিকাঠামোর জন্য একটি আন্তর্জাতিক জোট সি ডি আর-এর কথা ঘোষণা করেন। এই জোটের লক্ষ্য হল প্রতিরোধী পরিকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন দেশকে সহায়তা প্রদান করা। ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এই জোটে অংশ গ্রহণের জন্য এস সি ও সদস্যদের প্রতি আমন্ত্রণ জানান।

উজবেকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শ্রী আব্দুল্লা নিগমাটোভিচ আরিপভ, এস সি ও সদস্য রাষ্ট্রগুলির নেতা এবং প্রতিনিধিদলের প্রধানগণ, এস সি ওর মহাসচিব ভ্লাদিমির নরভ এবং আঞ্চলিক জঙ্গী বিরোধী কাঠামোর কার্যকরী নির্দেশক শ্রী জুমাখন গিয়োসবও বৈঠকে যোগদান করেন।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তাসখন্তে শাস্ত্রী স্ট্রিটে প্রাক্তন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর প্রতিমূর্তিতে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদন করেন। ১৯৬৫সালে যুদ্ধের পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তাসখন্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার একদিন পর ১৯৬৬ সালের ১১ই জানুয়ারী তদানিন্তন প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রী তাসখন্তে মৃত্যু বরণ করেন। শাস্ত্রীজীর স্মরণে নির্মিত বিদ্যালয়ও শ্রী সিং পরিদর্শন করেন।

এস সি ও পরিষদের সরকার প্রধানদের পরবর্তী বৈঠক ২০২০সালে ভারতে অনুষ্ঠিত হবে। (মূল রচনাঃ ড.আথার জাফর)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?