দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের মজবুত অংশীদারিত্ব

ভারতের পূবে কাজ করার নীতি এবং তার ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দৃষ্টিভঙ্গীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একাধিক আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে থাইল্যান্ড যাত্রা করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি ষোড়শ ভারত-আসিয়ান শিখর বৈঠক, চতুর্দশ পূর্ব এশিয়া শীর্ষ সম্মেলন ই এ এস এবং তৃতীয় RCEP শিখর শিখর বৈঠকে যোগ দেন। তাছাড়াও তিনি এই সব বৈঠকের অবসরে কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে নানান দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন। এর আগে, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এস জয়শংকর আগষ্ট মাসে ব্যাংককে আসিয়ান দেশগোষ্ঠীর একাধিক মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা করেন।

ষোড়শ ভারত-আসিয়ান শিখর বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী অবাধ, উন্মুক্ত, সর্বাত্মক এবং নিয়ম-ভিত্তিক ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় শৃংখলা গড়ে তোলার লক্ষ্যে পারস্পরিক স্বার্থের কথা বলেন। তিনি ভারতে আসিয়ান কেন্দ্রীকতা এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আসিয়ান দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের অভিন্ন নীতির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। তাছাড়া তিনি সামুদ্রিক সহযোগিতা, বাস্তব এবং ডিজিটাল যোগাযোগ, সমুদ্র ভিত্তিক অর্থনীতি এবং মানব সহায়তার আহ্বান জানান। ভারত কৃষি, বিজ্ঞান, গবেষণা, আই সি টি এবং ইঞ্জিনিয়ারিং এর মত ক্ষেত্রে ক্ষমতা নির্মাণের প্রতি আলোকপাত করেন। আসিয়ানে ভারতের যোগাযোগ প্রকল্পের জন্য এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ রয়েছে এবং বিভিন্ন প্রকল্প চিহ্নিত করা হচ্ছে তাছাড়া, এই ঋণ ব্যবহারের পন্থা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে। এর আগে, ভারত এবং আসিয়ান বাণিজ্যিক ভারসাম্য জনিত উদ্বেগ নিরসনে দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এফ টি এ পর্যালোচনার বিষয়ে একমত হয়েছে।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পূর্ব এশিয় শিখর বৈঠকেও অংশ নেন। ই এ এস এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ, বিস্তার রোধ এবং অনিয়মিত অভিবাসনের মত অভিন্ন উদ্বেগের বিষয়ে কৌশলগত সহযোগিতার পথ সুগম করতে অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে ভারত তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। নেতাগণ ই এ এস উন্নয়নী প্রয়াস সংক্রান্ত নম ফেন ঘোষণাপত্র এগিয়ে নিয়ে যেতে ম্যানিলা কর্ম পরিকল্পনার অগ্রগতির কথা উল্লেখ করেন। ই এ এস এ অবৈধ মাদক এবং অপরাধ দমন সংক্রান্ত তিনটি চুক্তি গৃহীত হয়।

এবারের আসিয়ান শিখর সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল আঞ্চলিক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব RCEP আলোচনা, একটি ১৬ দেশীয় বৃহদাকার এফ টি এ যাতে আন্তর্জাতিক জি ডি পির আনুমানিক ৩২ শতাংশ অর্জনের লক্ষ মাত্রা ধার্য করা হয়েছে। তবে RCEP আলোচনায় ফাঁটল দেখা দেয় এবং ভারত ছাড়াই অংশীদারদের মধ্যে আলোচনা চলে। ভারত এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গঠনমূলক মুক্ত বাণিজ্য উন্নয়নের কথা বলে।

RCEP শিখর সম্মেলনে যদিও অবশিষ্ট ১৫ সদস্য ১০ অধ্যায়ের সবগুলির জন্য টেক্সট ভিত্তিক আলোচনা সম্পূর্ণ করার কথা জানায়, তবে ভারত বকেয়া বিষয়গুলির ক্ষেত্রে আপত্তি জানিয়েছে। অধিক বাজারে প্রবেশাধিকার, শুল্ক বহির্ভুত প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি বিষয়ে মতপার্থক্যের কোনো সমাধান হয় নি। ফলে ভারত এই চুক্তিতে যোগদান না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি জোর দিয়ে বলেন যে ভারতীয়দের ওপর এর যে প্রতিকূল প্রভাব পড়তে পারে সে কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

থাইল্যান্ডে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী মোদি জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড এবং মিয়ানমারের সঙ্গে কৌশলগত স্বার্থ নিয়ে একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন।

ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-জাপান-অস্ট্রেলিয়ার আধিকারিকরা যোগাযোগ, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং নিরাপত্তার বিষয়ে বৈঠক করেন এবং জঙ্গী কার্যকলাপ বিরোধী ব্যবস্থাপনা, সাইবার ও সমুদ্র নিরাপত্তার বিষয়েও কথাবার্তা হয়।

ভারতের পূবে কাজ করার নীতির কেন্দ্র স্থলে রয়েছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া। ২০১৮তে ভারতের ৬৯তম সাধারণতন্ত্র দিবস উদযাপনের সময় ভারত দক্ষিণ পূর্ব এশিয় দেশগুলির ১০জন রাষ্ট্রপ্রধানকে আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে আসিয়ানের সঙ্গে বহুমুখী অংশীদারিত্বের ২৫ বছর স্মরণে আসিয়ান কেন্দ্রিকতার পরিচয় দেয়। তিন সি-কমার্স অর্থাৎ বাণিজ্য, কানেক্টিভিটি অর্থাৎ যোগাযোগ এবং কালচার অর্থাৎ সংস্কৃতি হল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি। তাই, আসিয়ান-ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবার লক্ষ্যে ভারত আসিয়ানে তাদের বিনিয়গ অব্যাহত রাখবে। (মূল রচনাঃ তিতলি বসু)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?