সৌদি আরব ও কাতারের মধ্যে সম্পর্ক

উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিল (জিসিসি)’র সুপ্রিম কাউন্সিলের চল্লিশতম শীর্ষ সম্মেলন সৌদি-কাতারের সম্পর্কের শীতলতা কমাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, কাতার সন্ত্রাসবাদী দলগুলিকে সমর্থন করছে, এই অভিযোগে সৌদি আরব, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং বাহরিন,কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করার ফলে এই সম্পর্কে অবনতি ঘটেছিল। সৌদি রাজা সালমান বিন আব্দুলাজিজ আল সৌদ, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানিকে রিয়াধে ২০১৯’এর জিসিসি শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানান।এর জবাবে, কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন নাসের আল থানিকে সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য প্রেরণ করা হয়। উল্লেখ্য, সৌদি আরব কাতারের সঙ্গে৬১কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত জুড়ে ২00 মিটার প্রশস্ত একটি খাল 'সালওয়া' খনন করে আরবীয় উপদ্বীপ থেকে কাতারকে পৃথক করে একটি দ্বীপে পরিণত করার পরিকল্পনা করেছিল।

তবে সৌদিআরব ও কাতারের মধ্যে সম্পর্কের এই শীতলতা কাটতে শুরু করেছে। সৌদি ARAMCO তৈলক্ষেত্রের ওপর হামলার ঘটনার প্রেক্ষিতেজরুরি নিরাপত্তা সংক্রান্ত শিখর সম্মেলনে যোগদানের জন্য এ বছরের গোড়ায় কাতারের প্রধানমন্ত্রী সৌদিআরব যান। সৌদি আরবের গোয়েন্দা বিভাগের প্রাক্তন প্রধান যুবরাজ তুর্কি অল-ফয়জল জানান, দোহায় আয়োজিত গালফ কাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায় সৌদিআরব, সম্মিলিত আরব আমীরশাহী এবং বাহরিনের যোগদান থেকে ইঙ্গিত মেলে যে এইদেশগুলি কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী।

এছাড়াও, বিভিন্ন আঞ্চলিক ঘটনায় বিশেষত আর্মকো হামলার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরপ্রতিক্রিয়া সৌদি আরবকে আমেরিকার উপর নির্ভরতা হ্রাস করতে এবং উপসাগরীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করতে পরিচালিত করেছিল। যেমনটি ২০১৯এর জিসিসি শীর্ষ সম্মেলনের যৌথ আলোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে।

তবে এই থেকে অদূরভবিষ্যতে কাতারের সংকট সমাপ্তির বিষয়টি সুনিশ্চিত করে না কারণ সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এখনও কাতারের বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তনের কোনও ইঙ্গিত দেয়নি।সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর বিদেশপ্রতিমন্ত্রী আনোয়ার গারগাশ কাতারকে এই সঙ্কটের জন্য দায়ী করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কাতার সংকট নিরসনে আরও সময় প্রয়োজন।বাহরিনের বিদেশমন্ত্রী খালিদ বিন আহমদ আল খলিফা জিসিসি শীর্ষ সম্মেলনে কাতারের আমিরের অনুপস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করেন এবং অভিযোগ করেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন ব্লকের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মতপার্থক্য দূর করতে কাতার আগ্রহী নয়।

অন্যদিকে, কাতারের বিদেশমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল্লা রাহমান বিন জাসিম আলথানি জানান, অন্য রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বিষয়গুলিতে হস্তক্ষেপ না করে ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি নিঃশর্ত আলোচনায় অংশ নিতে কাতার আগ্রহী। শুভেচ্ছামূলক পদক্ষেপ হিসাবে কাতারের আমির সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর রাষ্ট্রপতি শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানকে তাঁর ভাতৃবিয়োগে সমবেদনা জানান। তিনি অক্টোবরে কাতারে আয়োজিত একটি হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠানেও যোগ দেন।আরব বিশ্বের কাছে এটা যথেষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তবে জিসিসিতে এই বিবাদ ইরানের মতো অন্য আঞ্চলিক শক্তির জন্য সহায়ক বলে মনে করাহচ্ছে। ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলি থেকে বেরিয়ে আসতে আগ্রহী।

ভারত সবসময়ই কাতার সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।পারস্য উপসাগরে শান্তি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এছাড়াও, সৌদি আরবে ৩.২ মিলিয়ন এবং কাতারে ০.৬মিলিয়ন প্রবাসী ভারতীয় বসবাস করেন, যাদের সুরক্ষা ভারতের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ।বাণিজ্য, জ্বালানি ক্ষেত্র সহ নানা দিক থেকে সৌদি আরব ভারতের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।অন্যদিকে কাতার একমাত্র দেশ যার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি আমদানির চুক্তি রয়েছে।

চতুঃশক্তি যখন কাতারকে বিচ্ছিন্ন রাখে, তখনও ভারত ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছেএবং সকল পক্ষের মতপার্থক্য নিরসনের লক্ষ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সার্বভৌমত্ব এবং অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপনা করা সংক্রান্ত স্বীকৃত আন্তর্জাতিক নীতির ভিত্তিতে গঠনমূলক আলোচনার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বদিয়ে বিবৃতি জারি করে।আঞ্চলিক ও বিশ্বের স্থিতিশীলতার জন্য কাতারের সংকট নিরসন জরুরি এবং সৌদিআরব ও কাতারের মধ্যে সম্পর্ক নরম হলে তা হবে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল তথা ভারতের জন্য ইতিবাচক বিষয়।

(মূল রচনাঃডঃলক্ষ্মীপ্রিয়া)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?