১৯-তম ভারত-ইরান যৌথ কমিশনের বৈঠক

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ এস জয়শংকর ১৯-তম ভারত-ইরান যৌথ কমিশনের বৈঠকে যোগ দিতে সম্প্রতি ইরান সফর করলেন। দুটি দেশের বিদেশ মন্ত্রী এই কমিশনের বৈঠকে যুগ্মভাবে পৌরোহিত্য করেন। এই যৌথ কমিশন হল এমন একটি ব্যবস্থাপনা যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবার লক্ষ্যে গঠিত। ডঃ এস জয়শংকর এই সফরে ইরানের রাষ্ট্রপতি ডঃ হাসান রৌহানির সঙ্গে দেখা করেন ও কমিশনের এই বৈঠকে আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল আলি শামখানি ও সে দেশের সড়ক ও শহরাঞ্চলীয় উন্নয়ন মন্ত্রী মহম্মদ এসলামি’র সঙ্গে আলোচনা করেন।

যৌথ কমিশনের বৈঠকে দুটি পক্ষ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক দিকটি পর্যালোচনা করে। বৈঠকে প্রধান আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে ছিল স্থল, জল ও বিমান সংযোগ এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার প্রসঙ্গটি। বৈঠকে ইরানী কর্তৃপক্ষ, ভারতের সঙ্গে সহযোগিতায় সে দেশের ছাবাহার বন্দর প্রকল্পটির রূপায়ণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। ছাবাহার বন্দর প্রকল্পটি রূপায়ণের কাজ সম্পূর্ণ হলে এটি ভারতীয় উপমহাদেশ, ইরান, আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের প্রবেশ দ্বার হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। তেল সমৃদ্ধ ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত এই ছাবাহার বন্দরকে ভারত, তার পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজে কাজে লাগাতে পারবে এবং এই বন্দর কৌশলগত দিক থেকে পাকিস্তানের দগর বন্ধরের প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারবে; যেটি ছাবাহার বন্দর থেকে মাত্র ৮০ কিলো মিটার দূরত্বে অবস্থিত ও চীনা বিনিয়োগে গড়ে উঠছে। যৌথ কমিশনের এই আলোচনায় দুটি দেশ অবিলম্বে বাণিজ্য বিষয়ক যৌথ কর্মী গোষ্ঠীর বৈঠক আহ্বানে সম্মত হয়েছে, যে বৈঠক সীমা শুল্ক বিষয়ক দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা সহ অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি চূড়ান্ত করার পথ সুগম করবে। দুটি দেশ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পুনরায় ব্যক্ত করেছে ও সন্ত্রাসবাদীদের সব আশ্রয়স্থল নির্মূল করার আহ্বান জানিয়েছে। এ ছাড়া এই অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রয়াসকে সর্বান্তকরণে সমর্থনে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। আলোচনার পর ইরানের বিদেশমন্ত্রী জাভাদ জারিফ এই বৈঠককে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করেছেন; এবং দুটি দেশের মধ্যে যুগপ্রাচীন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা স্মরণ করেছেন।

ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ক্রমাবনতির প্রেক্ষিতে এই যৌথ কমিশনের বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ জড়িত বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে দুটি দেশের ঘনিষ্ঠভাবে কাজ কোরে যাবার সংকল্প গ্রহণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ কয়েকটি দেশের সম্পাদিত পরমাণু চুক্তি থেকে ওয়াশিংটন একরফাভাবে বেরিয়ে গেছে ও তেহেরানের ওপর অত্যন্ত কঠোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শাস্তি ব্যবস্থা বজায় রেখেছে; যে কারণে ওই দেশ থেকে ভারতের তেল আমদানি বিশেষভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

১৯-তম ভারত-ইরান যৌথ কমিশনের বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক মৈত্রী চুক্তি সম্পাদনের ৭০-তম বার্ষিকী আগামী বছর উদযাপনের প্রস্তুতির বিষয়ে কথা হয়েছে। এর অঙ্গ হিসেবে দুটি দেশ সংসদ সদস্যদের সফর বিনিময় ও সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজনের যোজনা রচনা করছে।

যৌথ কমিশনের বৈঠকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক যাবতীয় প্রতিকূলতা সত্বেও দ্বিপাক্ষক বহুমুখী সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাবার সুস্পষ্ট সংকল্প ব্যক্ত করা হয়েছে। অতীতেও দুটি পক্ষ সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্তরে নিয়মিত আলাপ আলোচনা করেছে ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ক্রমাগত মজবুত করার লক্ষ্যে কাজ করেছে। ইরানের রাষ্ট্রপতি ডঃ হাসান রৌহানি গত বছর নতুন দিল্লি সফর করে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ বছর সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ সভার ৭৪-তম অধিবেশনে অংশগ্রহণের অবসরে ইরানের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যেখানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক দিকটি নিয়ে দুই নেতার মধ্যে বিস্তারিত কথা হয়েছে। সম্প্রতি সম্পন্ন যৌথ কমিশনের আলোচনা, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার আদর্শকে ক্রমগত মজবুত করার লক্ষ্যে নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান যোগাবে। (মূল রচনাঃ- ডঃ আসিফ সুজা)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?