ভারত-ওমান কৌশলগত সম্পর্কের অগ্রগতি
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে ভৌগলিক অবস্থানের নিরীখে ওমান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ হলেও তার ক্ষমতাশালী প্রতিবেশী দেশগুলির তুলনায় ওমান আন্তর্জাতিক মনোযোগ ততটা আকর্ষণ করতে পারে নি। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন চলেছে এবং অর্থনৈতিক বিকাশ হয় নি। সুলতান কাবুসের নেতৃত্বে ওমান ক্রমশ এই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি সম্পদের মাধ্যমে আসা অর্থ জনকল্যাণে ব্যবহার করার ফলে সমৃদ্ধি আসছে। সুলতান কাবুসের নেতৃত্বে ওমান প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখায় উপসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে এবং সমাধানসূত্র নির্ণয়ে ওমান বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে।
ভারত, ওমানের এই ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে গত কয়েক দশকে সেদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার প্রয়াস নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতের রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক প্রয়াসে ওমানকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ওমানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪’য় দায়িত্বভার গ্রহণের পর ওমানের বিদেশমন্ত্রী ইউসুফ বিন আলাউই প্রথম বিদেশী প্রতিনিধি যিনি ভারত সফর করেন। তদানীন্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ২০১৫’র ফেব্রুয়ারিতে ওমান সফর করেন। এরপর ২০১৬ সালে তদানীন্তন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর পারিকর মাসকট সফরে যান।
২০১৮’র ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরদার করার লক্ষ্যে ওমান সফরে যান এবং সুলতান কাবুসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। উভয় নেতা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্কের অগ্রগতি এবং সন্ত্রাসের মোকাবিলায় নিরাপত্তা সম্পর্ক আরো জোরদার করা এই বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল। ভারত এবং ওমান সমুদ্র নিরাপত্তা ক্ষেত্রে একযোগে কাজ করতে সম্মত হয় এবং এই সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকপত্র সাক্ষর করে। এর আওতায় ভারত মহাসাগরে ভারতীয় নৌবাহিনীর টহলদারি জাহাজ ওমানের দুকাম বন্দর ব্যবহার করতে পারবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডঃ এস জয়শঙ্কর এই সপ্তাহে ওমান সফর করেন। তিনি এই সফরে ওমানের বিদেশ মন্ত্রী ইউসুফ বিন আলাউই’এর সঙ্গে বৈঠক করেন। উভয় নেতার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে আলোচনা হয়। দুদেশের মধ্যে জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাসকটে বসবাসকারী ভারতীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গেও কথা বলেন। উল্লেখ্য, ওমানে ৭ লক্ষ ৮০ হাজার ভারতীয় রয়েছেন। সেদেশের অর্থনৈতিক বিকাশে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন।
উল্লেখ্য, ভারত এবং ওমান গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার দেশ। ২০১৮-১৯’এ দুদেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারত, ওমান থেকে জ্বালানি ও সার আমদানিকারী অন্যতম দেশ।
ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ওমানকে অন্যতম কৌশলগত অংশীদার দেশ হিসেবে গণ্য করে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, ডঃ জয়শঙ্করের ওমান সফরে ওমানের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে, যা ওমানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরো মজবুত করতে সহায়ক হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর দুদেশের মধ্যে মজবুত সম্পর্ক এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন দিল্লির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক গুরুত্বকেই তুলে ধরে।
(মূল রচনাঃ ডঃ মহম্মদ মুদাসসির কামার)
Comments
Post a Comment