নেপাল সরকার মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানের বিধি নিয়ম কঠোর করছে

নেপাল সরকার, সে দেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে অবস্থিত বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানের জন্য পর্বতারোহী দলের কাছ থেকে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব আয় কোরে থাকে। তবে এই পর্বত শৃঙ্গ আরোহণে অভিযাত্রী দলের সংখ্যা ও দলের সদস্যদের মৃত্যু হারে ক্রমশ বৃদ্ধির কারণে নেপাল সরকার বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আবহাওয়ার দিক থেকে বছরের যে সময়টি এভারেস্ট অভিযানের অনুকূল বলে বিবেচনা করা হয়, সব অভিযাত্রী দলই সেই সময়টির সুযোগ নিয়ে শৃঙ্গে আরোহণ করতে চান ;আর যার ফলেই যাত্রা পথে অভিযাত্রীদের ভিড় বাড়ে। আর এর সঙ্গে বাড়ে মৃত্যু হার। যেমন এ বছর মে মাসেই ১১ জন পর্বতারোহীর মৃত্যু হয়েছে। ২০১৫ সালের ২৫’এ এপ্রিল সমগ্র হিমালয় অঞ্চলে তীব্র ভূমিকম্পের জেরে ভয়াবহ তুষার ধ্বসে চাপা পড়ে ২২ জন পর্বতারোহী প্রাণ হারান। এ বছর প্রায় ৮০০ জন অভিযাত্রী প্রায় একই সঙ্গে এভারেস্ট শৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা করেন, ফলে তাঁদের মধ্যে অনেকেকেই প্রায় ৮ হাজার মিটার উচ্চতায় “মরণ ফাঁদ” হিসেবে কুখ্যাত একটি অঞ্চলে লাইন দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়। উচ্চ পার্বত্য এলাকায় চরম প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশে দীর্ঘ সময় একই স্থানে অপেক্ষার কারণে স্বাভাবিক ভাবেই মৃত্যুর আশংকা বাড়ে। নেপাল সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ২২’এ মে তারিখে একই দিনে ২২৩ জন পর্বতারোহী এভারেস্ট শৃঙ্গ জয় করেন, যা ৮৮৪৮ মিটার উচ্চ বিশ্বের এই সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানের ইতিহাসে এ পর্যন্ত এক রেকর্ড। ২০১৬’তে এই সংখ্যা ছিল ২০৪।

সমগ্র বিষয়টি খতিয়ে দেখে নেপাল সরকার একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। এবং এই কমিটি একগুচ্ছ বিধি নিয়ম রচনা করেছে, যেগুলি সরকার ২০২০ থেকে কার্যকর করবে বলে পরিকল্পনা নিয়েছে। এই নির্ধারিত নিয়ম বিধি অনুযায়ী, এভারেস্ট অভিযানে আগ্রহী প্রত্যেক পর্বতারোহীকে প্রয়োজনীয় ফি বাবদ ১১ হাজার ডলার জমা করার, নেপাল অঞ্চলে অন্তত সাড়ে ৬ হাজার মিটার উচ্চ একটি পর্বত শৃঙ্গ জয় করার ও উত্তম শারীরিক অবস্থার প্রমাণপত্র পেশ করতে হবে। সংশোধিত বিধি নিয়ম অনুসারে প্রত্যেক অভিযাত্রীকে এভারেস্ট মূল শিবিরে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে; প্রত্যেকের জীবন বিমা ছাড়াও অনুসন্ধান, উদ্ধার ও চিকিৎসা ব্যয় বাবদ বীমা করাতে হবে। এ ছাড়াও উচ্চ পর্বত শৃঙ্গ আরোহণকারী অভিযাত্রীদলের নেতৃত্ব দানের অন্তত তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানের আয়োজক সংস্থাকে অন্তত ৩৫ হাজার ডলার; ও আট হাজার মিটারের অধিক উচ্চ অন্যান্য পর্বত শৃঙ্গ অভিযানের জন্য আয়োজক সংস্থাকে ২০ হাজার ডলার জমা করতে হবে। নেপাল সরকার অভিযাত্রী দলের সংখ্যাও সীমিত করার চিন্তাভাবনা করছে।

উল্লেখ করা যেতে পারে, মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানের যোগ্যতা অর্জনের জন্য বর্তমান নিয়ম বিধির আওতায় আগ্রহী পর্বতারোহীকে কেবল মাত্র তিনটি শর্ত পুরণ করতে হয়। সেই অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পর্বতারোহীকে পাশপোর্টের একটি প্রতিলিপি, একটি সংক্ষিপ্ত ব্যক্তিগত তথ্য ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রমাণপত্র পেশ করতে হয়।

সেই ১৯৫৩ সালে এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নরগে সর্বপ্রথম এভারেস্ট আরোহণ করার পর থেকে বিশ্বের এই সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ জয়ের লক্ষ্যে অভিযাত্রীদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ ক’রে ৯০’এর দশকের পর থেকে। এর ফলে যাত্রা পথে বছরের পর বছর মনুষ্য মল, তাঁবু, দড়ি, খালি অক্সিজেন সিলিন্ডার, মই, প্লাস্টিক বোতল ও খাদ্যের অবশিষ্টাংশের মত বিভিন্ন ধরণের আবর্জনা জমা হচ্ছে। এ বছরেই চার পর্বতারোহীর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে, ও সঙ্গে প্রায় ১১ টন এই ধরণের আবর্জনা অপসারণ করা হয়েছে।

বিশ্ব উষ্ণায়ন ও পরিবেশের ওপর এর প্রতিকূল প্রভাবের কারণে হিমানি সম্প্রপাত, ভূমি ধ্বস ও বন্যার ঘটনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আফগানিস্তান থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত হিমালয় অঞ্চলে মোট যে সংখ্যায় হিমবাহ রয়েছে, এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে তার অন্তত এক-তৃতীয়াংশের বরফ বর্তমান শতাব্দীর শেষ নাগাদ গ’লে যাবার আশংকা আছে বলে বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

ভারত, নেপালের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। নতুন দিল্লি বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে হিমালয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে তার সংকল্প বার বার ব্যক্ত করেছে। হিমালয় অঞ্চলকে দূষণ মুক্ত রাখতে ও জলবায়ূ পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নতুন দিল্লি একটি জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে, যার আওতায় সিকিম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড ও উত্তরাঞ্চল সহ ১২ টি পার্বত্য প্রদেশ-ব্যাপী হিমালয় অঞ্চলের দেড় হাজারের মত স্থানে গত বছর আবর্জনা অপসারণের একটি ব্যাপক কর্মসূচি রূপায়ণ করা হয়েছে। (মূল রচনাঃ- রতন সালদি)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?