ইরাকের দোদুল্যমানতা

গত দুমাসের বেশি সময় থেকে ইরাকের যুব সম্প্রদায় দুর্নীতি, কর্মহীনতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইরান এবং আমেরিকার হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। সরকার-বিরোধী এই সব বিক্ষোভ ব্যাপক আইন অমান্য আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। নজফ, কারবালা, বাসরা এবং বাগদাদ সহ সমস্ত বড় শহরে অবস্থান সমাবেশের আয়োজন করা হচ্ছে। খবরে জানা যাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী এবং ইরানী রেভলুশনারী গার্ডস কর্প্সের অনুগত পপুলার মোবিলাইজেশন বাহিনীর সঙ্গে যোগ সাজসে ফলে সসস্ত্র বাহিনীর হাতে চারশোর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী আদেল আব্দুল মেহদি পদত্যাগ করেছেন। এর আগে প্রভাবশালী শিয়াপন্থী মৌলভী আয়াতোল্লাহ আলি আল সিস্তানি তাঁর সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করার জন্য সংসদের প্রতি আহ্বান জানান। দুদিন পর সংসদ তার ইস্তফাপত্র মঞ্জুর করে এবং রাষ্ট্রপতিকে নতুন প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন করতে বলে। তবে, প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। এখন আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল বাগদাদের তাহরির স্কয়ারে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ইরাকী যুব সম্প্রদায়ের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল অর্থনৈতিক সমস্যা এবং দুর্নীতি। ২০০৩এর মার্কিন আক্রমণের সময় থেকেই ইরাক জনগোষ্ঠীগত সমস্যা এবং গৃহযুদ্ধের সম্মুখিন। নিয়মিত নির্বাচন সত্বেও রাজনৈতিক স্থিরতা এখনও দেখা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে ইরাক বড় তেল রপ্তানীকারী দেশ হয়ে ওঠা সত্বেও তাদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা দূর হয় নি। জনগণ এর কারণ হিসেবে রাজনৈতিক শ্রেণীর অর্থ তশ্রুপ এবং দুর্নীতিকেই দায়ী করেছে।

আরব স্প্রিং এর পর যে সমস্যার সৃষ্টি হয় তা এই দূরবস্থা কাঠিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে আরো জটিলতার সৃষ্টি করেছে। ২০১৩-১৪তে দায়েশ বা আই এস আই এস এর উত্থান ইরাককে একেবারে ভগ্ন দশায় নিয়ে আসে, কারণ জঙ্গী গোষ্ঠীগুলি দ্রুত সবল হয় এবং তাদের বড় ভূখন্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এর পর ২০১৪র জুন মাসে তারা খলিফাতন্ত্র ঘোষণা করে। ২০১৭র ডিসেম্বরে মোসুলের পতন এবং দায়েশের পরাজয়ের পরেও ইরাকের জনগণের দঃখ দুর্দশার অবসান হয় নি।

২০১৮র মে মাসে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচন ইরাকে নতুন যুগের সূচনা করবে বলে আশা করা হয়েছিল। ধরে নেওয়া হয়েছিল যে ব্যাপক দুর্নীতি, কর্মহীনতা, রাজনৈতিক উদাসীনতা এবং জনগোষ্ঠীগত উত্তেজনার অবসান ঘটবে। তবে, নির্বাচনে খন্ডিত জনমত সামনে আসে এবং সরকার গঠন বিলম্বিত হয়। নব নির্বাচিত সংসদের সরকার গঠন করতে পাঁচ মাসের বেশি সময় লাগে। আদেল আব্দুল মেহদি অক্টোবর ২০১৮তে কার্যভার গ্রহণ করেন কিন্তু জনগণের আস্থা অর্জনে তেমন কিছু করতে পারেন নি।

যুব সম্প্রদায়ের সামনে আরেকটি অভিন্ন বিষয় হল ইরানীরা ইরাকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হুসেনের শাসনকালে ইরান তাদের মজবুত রাজনৈতিক এবং সামরিক উপস্থিতির বলে, ইরাকে বড় ভূমিকা নেয়। আই আর জি সি প্রশিক্ষিত শিয়া মিলিশিয়ারা পি এম এফ গঠনের মাধ্যমে দায়েশকে পরাস্থ করার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান যোগায়। আরো অভিযোগ করা হয় যে ২০১৮র নির্বাচনের পর সরকার গঠনে বিলম্বের কারণ হল তেহেরানের মধ্যস্ততা।

বাগদাদে বিশাল মার্কিন প্রভাব রয়েছে, তাছাড়া আরব উপসাগরের রাজতন্ত্রগুলি বিশেষ করে সৌদি আরবও বাগদাদে তাদের প্রভাব খাটাতে চাইছে। ইরাকীদের চোখে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের প্রভাব বাগদাদের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাজ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে, তাই উভয়ের বিরুদ্ধেই বিক্ষোভকারীরা তাদের আক্রোশ প্রদর্শন করছে।

ইরাকে বিশাল তৈল ভান্ডার মজুদ রয়েছে এবং তারা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানীকারক দেশ। ভারতও ইরাক থেকে তেল আমদানী করে থাকে। ২০১৮ থেকে সৌদি আরবকে দ্বিতীয় স্থানে ফেলে তারা ভারতে শীর্ষ তেল সরবরাহকারী দেশ হয়ে উঠেছে। সেই কারণেই নতুন দিল্লীকে ইরাকের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে হবে। তবে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দরুণ ভারত তাদের তেল আমদানীতে বৈচিত্র এনেছে।

ইরাকী কর্তৃপক্ষ এই বিক্ষোভের শান্তিপূর্ণ সমাধান করতে না পারায় এবং সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব না নেওয়ায় আরো জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে ইরাক দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে এবং ভবিষ্যৎ রুপরেখা তাদের অবশ্যই যথাশীঘ্র স্থির করতে হবে। ইরাকের সংবেদশীল পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে বৃহত্তর মধ্য প্রাচ্যকে প্রভাবিত করবে। আর এটি অবিদিত নয় যে সেখানে আগে থেকেই উত্তেজনা বিরাজ করছে। সামগ্রিক পরিস্থিতির নিরিখে ভারত আশা করে ইরাকী সরকার তার জনগণের অভাব অভিযোগ নিরসনে উপযুক্তভাবে সচেষ্ট হবে এবং সংকটাপন্ন এই দেশে শান্তি এবং নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। (মূল রচনাঃ ড.মহম্মদ মুদাস্‌সির কমর)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?