ভারতের আঞ্চলিক আর্থিক নীতিঃ ২০২০ ও পরবর্তী সময়
নতুন বর্ষ ২০২০তে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতের একটি স্পষ্ট ও সুপরিকল্পিত আঞ্চলিক আর্থিক নীতির প্রাথমিক রূপরেখা প্রতিভাত হচ্ছে। এতদিন পর্যন্ত অবাধ বাণিজ্য চুক্তি – FTA’কে আঞ্চলিকভাবে প্রাসঙ্গিক থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে ধরা হত। ভারতের জন্য এটিকে একমাত্র বিকল্প হিসেবে মানা হয়েছে যাতে এটা সুনিশ্চিত করা যায় যে, বিশ্বের কাছে ভারতের কন্ঠস্বর পৌঁছয়। এই ভাবনার নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন ঘটে যখন ভারত আঞ্চলিক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব - RCEP থেকে সরে আসে। এটি আমাদের বৈদেশিক আর্থিক নীতির দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে।
RCEP থেকে সরে আসার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় ব্যাঙ্কক শিখর সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে। ভারতের বার্তা ছিল স্পষ্ট। ভারতের কৃষক সম্প্রদায় এবং অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ – MSME’গুলির স্বার্থ সুরক্ষিত না হলে ভারত এই ধরণের গোষ্ঠী থেকে সরে আসতে সময় নেবে না। ভারত দ্রুত বিকাশশীল অর্থনীতি হিসেবে আগামী কয়েক বছরে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে এবং স্পষ্টতই এই অগ্রগতি, আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্বার্থকে ব্যাহত করে এমন কর্মকৌশলের ওপর নির্ভর করে না।
ভারতের অধিকাংশ বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে পূর্ব এশিয় প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে। পূবে তাকাও এবং পূবে সক্রিয় নীতিরই এটি ফলশ্রুতি। তবে এই সব চুক্তি ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতি, এই সব বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা এবং FTA’এর যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার ফলে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই বৈদেশিক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক নীতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ স্বার্থের চাহিদার মধ্যে বৈপরীত্যের প্রেক্ষিতে একটি স্বচ্ছ এবং স্পষ্ট নীতির প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। সরকার অভ্যন্তরীণ স্বার্থ রক্ষার দিক থেকে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে রক্ষাত্মক মনোভাব পোষণ করবে না। পারস্পরিক স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখেই আলোচনা হবে।
সংরক্ষণবাদী নীতির প্রসারের আশঙ্কার মধ্যেই ভারত বর্তমান চুক্তিগুলির পুণর্মূল্যায়ন করা এবং নতুন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং আসিয়ান দেশগুলির সঙ্গে সম্পাদিত অবাধ বাণিজ্য চুক্তিগুলিতে সংশোধনী ধারার সংস্থান রয়েছে। ভারত তার প্রয়োগ করতে আগ্রহী। ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ব্যাপক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি – BITA’র স্থগিত থাকা আলোচনা আবার শুরু করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে সক্রিয়ভাবে আলোচনা চালাচ্ছে। ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেনের সঙ্গেও একটি বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারতের জন্য লাভজনক হওয়ার প্রেক্ষিতে ইজরায়েল, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং ইউরেশিয় ইকনমিক ইউনিয়নের সঙ্গেও ভারত আলোচনায় যুক্ত হতে চাইছে।
ভারত মুক্ত, অবাধ ও নিরপেক্ষ বাণিজ্য ও বিনিয়োগে উৎসাহ দেখিয়ে আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক ক্ষেত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিয়েছে। ভারত FTA আলোচনার আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পরামর্শ গ্রহণের কথাও জানিয়েছে। এই বিষয়ে তাড়াহুড়ো করা হবে না এবং নতুন FTA’র পরিবর্তিত শুল্ক সহ নতুন নিয়মাবলীর বিষয়ে প্রস্তুত হওয়ার জন্য শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষেত্রকে যথেষ্ট সময় দিতে হবে। FTA শুধুমাত্র পণ্য ক্ষেত্রই নয়, পরিষেবা ক্ষেত্রেও লাভজনক হবে। এর সঙ্গে ভারতের যথেষ্ট স্বার্থ জড়িত রয়েছে। ভারতের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে ২০২০ সাল একটি নতুন এবং উজ্জ্বল অধ্যায় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
( মূল রচনাঃ সত্যজিৎ মোহান্তি )
Comments
Post a Comment