মার্কিন-ইরান উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান ভারতের

বাগদাদ বিমানবন্দরে ইরানের শীর্ষ সামরিক আধিকারিক কাশেম সোলেমানির ওপর মার্কিন হামলার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এই হামলায় ঘটনায় ইরানের জনমানসে মার্কিন বিরোধী মনোভাব তীব্রতর হয়েছে, যার ফলে দুদেশের মধ্যে আলোচনার পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। মধ্য প্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে আনা এবং ইরানের পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হয়ে ওঠা প্রতিহত করা – মার্কিন প্রশাসনের এই দুই লক্ষ্যপূরণের পথে এটি ক্ষতিকারক পদক্ষেপ। কোনোরকম পূর্বসংকেত ছাড়াই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরণের পদক্ষেপ, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সহযোগীদের আশঙ্কিত করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে এই দেশগুলির জাহাজ চলাচলের পথ এবং তৈল নিষ্কাশন পরিকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠায় তারা ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনের প্রয়াস চালাচ্ছিল।

এদিকে ইরান ইরাকস্থিত দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে এই হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছে। তেহেরান জানিয়েছে, জেনারেল সোলেইমানি একজন সামরিক আধিকারিক হওয়ায় লক্ষ্যবস্তু হিসেবে সামরিক ঘাঁটি বেছে নেওয়া হয়েছে। আল আসাদ এবং এরবিল বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য ক’রে ঐ হামলায় মার্কিন অথবা ইরাকি সেনা হতাহত হয় নি। তবে মার্কিন রাষ্ট্রপতি এই প্রেক্ষিতে জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তেহেরানের বিরুদ্ধে কোনোরকম হামলা চালাবে না। এটাকে দুদেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের একটি পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। ইরানও এই মুহূর্তে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ না নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

এই আশ্বাস সত্বেও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে উত্তেজনা রয়েছে। দুটি দেশের মধ্যে এই উত্তেজনা চলতে থাকলে তার সরাসরি প্রভাব জ্বালানি তেলের দাম এবং জাহাজের বীমা সহ জাহাজে পণ্য পরিবহণের ওপর পড়বে। প্রসঙ্গত ভারত, ইরান থেকে জ্বালানি তেল আমদানি না করলেও ভারতের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যেকোনো ধরণের উত্তেজনা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করবে। ভারতের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি মূল্যের বৃদ্ধি যথেষ্ঠ চাপ সৃষ্টি করবে। জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের ওপর হামলার আশঙ্কার প্রেক্ষিতে ভারত উপসাগরীয় সমুদ্রাঞ্চলে নৌবাহিনী মোতায়েন করেছে। এর ফলে জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও বাড়ছে।

জ্বালানি ছাড়াও ক্ষেপনাস্ত্র বা অন্যান্য হামলার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কর্মরত এবং আরব দেশগুলিতে বসবাসকারী ভারতীয়রাও বিপদের সম্মুখীন হবেন। উল্লেখ্য, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে প্রায় ৮০ লক্ষ ভারতীয় বসবাস করেন যাদের মাধ্যমে দেশে প্রতিবছর ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আমদানি হয়।

এছাড়াও এই অঞ্চলে উত্তেজনার ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উল্লেখ্য, ভারত সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে তাদের প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক আরো মজবুত করার নীতি গ্রহণ করেছে। এর ফলে ওমান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমীরশাহীর মতো দেশগুলির সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বেড়েছে।

এই প্রেক্ষিতে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক টি এসপারের সঙ্গে কথা বলেছেন। উভয় নেতা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। রাজনাথ সিং উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের স্বার্থের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। উভয়ে দুদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরো মজমুত করার অঙ্গীকার করেন।

ভারত চাবাহার বন্দরের বিকাশে ইরানের অন্যতম সহযোগী। পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের নিষেধাজ্ঞার ফলে ভারতীয় সংস্থাগুলি সেখানে বিনিয়োগ করতে পারছে না। অস্থিরতার দরুণ চাবাহার বন্দরে বিনিয়োগও ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে ভারতের বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য তা ক্ষতিকর। এই প্রেক্ষিতে ভারতকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে হবে এবং উত্তেজনা প্রশমনের সবরকম প্রয়াসে উৎসাহ দিতে হবে।

(মূল রচনাঃ ডঃ স্তুতি ব্যানার্জি)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?