রাইসিনা বার্তালাপ ২০২০
আমরা একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকে প্রবেশ করলাম, সেই সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিশ্ব নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন এবং বড় রকমের ক্ষমতা পরিবর্তন। কিছু কিছু নতুন ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিছু পুরনো ক্ষমতা বিশ্বে তাদের অবস্থান থেকে সরে আসছে। দু’ ধরণের ঐতিহাসিক ক্ষমতা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে-ক্ষমতা রূপান্তর এবং ক্ষমতা বন্টন। চীনের উত্তরণ বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তবে ভারতও আন্তর্জাতিক পরিদৃশ্যে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উত্তেজনা এবং বিশ্ব পরিবেশ পরিবর্তনের নির্ণায়ক প্রভাবের উৎস হিসেবে এশিয়া অর্থনৈতিক মাধ্যাকর্ষণের আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
এই সময়ে উদ্ভাবন হল ভবিষ্যতের চাবি-কাঠি। উৎদ্ভাবনের ইতিহাসই ধারণার মূলকথা। উদ্ভাবন ব্যতিরেকে তলিয়ে যেতে হবে অতল গহ্বরে। বিদেশ নীতি এবং কৌশলগত স্বার্থের ক্ষেত্রেও একথা সমানভাবে সত্য। বিশ্বের নতুন জটিলতা যেমন গুরুতর চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়েছে তেমনি সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে প্রচুর। বিশ্বের ভর কেন্দ্র প্রাচ্যের দিকে সরে সাওয়ায় পাশ্চাত্যের দীর্ঘ দিনের প্রাধান্যের অবসান হতে চলেছে। প্রয়োজন হল নতুন চিন্তাধারা এবং নতুন বিশ্ব অবভিমতের। এই প্রেক্ষাপটে, রাইসিনা বার্তালাপকে বিশ্লেষন করতে হবে ভৌগলিক রাজনীতি এবং ভৌগলিক অর্থনীতির ভারতীর মঞ্চ হিসেবে।
নরেন্দ্র মোদি সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ভারতের বিদেশ নীতি উন্নত এবং সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ভারত গণতন্ত্র, জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশ এবং বিশাল বাজারের মত শক্তিকে ব্যবহার করেছে বিদেশ নীতির লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে। মজবুত অর্থনীতি এবং সক্রিয় বিদেশ নীতি রাইসিনা বার্তালাপের সাফল্যের কারণ। গত বেশ কয়েক বছর ধরে, রাইসিনা বার্তালাপে ২০১৭সালের নিউ নর্মাল থেকে শুরু করে, ২০১৮র ক্ষতিকর রূপান্তর, ২০১৯এর নতুন জ্যামিতিক পরিদৃশ্য এবং ২০২০ শতকের সূচনা লগ্নে পরিবর্তনশীল বিশ্বের বিভিন্ন দিকের প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে।
রাইসিনা ডায়লগের পঞ্চম সংকলনে রাশিয়া, ইরাণ, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া সহ রেকর্ড সংখ্যক ১২টি দেশের বিদেশমন্ত্রীরা এবং বিভিন্ন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানগণ, বেশ কিছু কৌশলগত চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ এবং আরো অনেকে অংশ গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনী বৈঠকে যোগ দেন।
বার্তালাপে ভাষণ দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ. এস জয়সংকর বলেন ভারত এবং চীনের সম্পর্ক জটিল কিন্তু কারো কাছেই এই সম্পর্ক ভুল প্রমানিত নয়। তিনি ক্ষতিকর শক্তিগুলিরর মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করার জন্য ভারতের স্থিতিশীল ভূমিকার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা করে বলেন যে ভারত আঞ্চলিক সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দরজা উন্মুক্ত রেখেছে।
অনেক বিশ্ব নেতা ভারতকে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি বলে মনে করেন। অনেকে বলেন তাদের সম্মৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য ভারতের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। রুশ বিদেশ মন্ত্রী সারগেই লাভরভ রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদের জন্য ভারতের প্রতি মস্কোর পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। তবে লাভরভ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের সমালোচনা করেন। ইরাণের বিদেশ মন্ত্রী কাভেদ জারিফ মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের তীব্র সমালোচনা করেন।
অন্যান্য যে সব বিশিষ্ট ব্যক্তি তিন দিনের বৈঠকে বক্তব্য রেখেন তাদের মধ্যে ছিলেন নিউ জিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হেলেন ক্লার্ক, প্রাক্তন আফগান রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই, প্রাক্তন ক্যানাডিয় প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার, সুইডেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ক্লার্ক বিল্ড, ডেনমার্কের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এ্যান্ডার্স রাসমুসেন, ভুটানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেরিং টোবগে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হ্যান সিউং-সু। তাদের অধিকাংশই প্রাক্তন ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী এ্যান্ডার্স রাসমুসেনের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করেন। তিনি বলেন ভারতকে তিনি আন্তর্জাতিক গণতন্ত্রগুলির জোটের একটি শক্তিশালী উপাদান হিসেবে দেখতে চান। ক্যানাডার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার বলেন বহুমেরু বিশিষ্ট বিশ্বের ভবিষ্যত জটিলতার উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে ভারত কী ভূমিকা পালন করে তার ওপর।
ভারত অনেকটা পথ অতিক্রম করে এসেছে। তবুও তার সামনে নানান চ্যালেঞ্জ রয়েছে, বিশেষ করে তার প্রতিবেশী অঞ্চলেই এই চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। অনেক সুযোগ এখনও কাজে লাগানো যায় নি। ভৌগলিক রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য তাদের প্রয়াস অব্যাহত থাকবে। প্রতিরক্ষা প্রধান হিসেবে জেনারেল বিপিন রাওয়াত বলেন সন্ত্রাসবাদ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যুবসম্প্রদায়ের মৌলিকীকরণ দূর করার বিষয়ে জেনারেল রাওয়াতের সুপারিশকৃত সমাধানসূত্র সরকার অনুসরণ করে কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়। (মূল রচনাঃ অ্যাশ নারায়ন রায়)
Comments
Post a Comment