নাইজার ও টিউনিশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরো মজবুত করার প্রয়াস ভারতের

আফ্রিকার দেশগুলির সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো জোরদার করার লক্ষ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি নাইজার ও টিউনিশিয়া সফর করলেন। রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে এই আফ্রিকী দেশগুলি রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতকে বিশেষভাবে সমর্থন জানিয়ে এসেছে। এই প্রেক্ষিতে নতুন দিল্লি এই দেশগুলিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। উল্লেখ্য, পররাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্বভার গ্রহণের পর এটিই ডঃ জয়শঙ্করের প্রথম আফ্রিকা সফর।

নাইজারের নিয়ামেতে তাঁর সফরে ডঃ জয়শঙ্কর সেদেশের রাষ্ট্রপতি মহামাদু ইস্‌সোউফোউ’এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা যৌথভাবে মহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারের উদ্বোধন করেন। এটি গান্ধীর সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উদযাপনের অঙ্গ হিসেবে আফ্রিকায় ভারত নির্মিত প্রথম কেন্দ্র। ভারত-নাইজার সম্পর্কের দিক থেকে এই কেন্দ্রটির স্থাপনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এই নির্মাণ আফ্রিকার প্রতি ভারতের দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধতাকেই তুলে ধরে। কেন্দ্রটির পরিসর প্রশস্ত এবং এতে আফ্রিকী ইউনিয়ন – AU’র সদস্য দেশসমূহের সঙ্গে বৈঠক সহ বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনের উপযোগী ২ হাজার আসন বিশিষ্ট প্রেক্ষাগৃহ সহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা রয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ জয়শঙ্কর নাইজারের প্রধানমন্ত্রী ব্রিগি রাফিনির সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। নাইজারের বিদেশমন্ত্রী কাল্লা আংকাউরাউ’এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও তিনি আলোচনা করেন। দুদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো মজবুত করার লক্ষ্যে একাধিক চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলার মত অভিন্ন চ্যালেঞ্জগুলির বিষয়েও তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়।

উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দুদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ভারত নাইজারের পরিবহন, বিদ্যুৎ সংযোগ, সৌরশক্তি এবং পানীয় জল সহ একাধিক প্রকল্পে ঋণদান করেছে। ভারতের প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক কর্পোরেশন ITEC’র প্রকল্পের আওতায় নাইজারের আধিকারিকরা সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। গত জুলাই মাসে নিয়ামেতে AU শিখর সম্মেলনের আয়োজনেও ভারত বিশেষভাবে সহায়তা করে।

অন্যদিকে নাইজারও ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশন, ICAO পরিষদ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিশেষ পদের জন্য ভারতের দাবিকে সমর্থন জানিয়েছে। নাইজারের সঙ্গে ভারতের ব্যবসা বাণিজ্যের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৬-১৭ বর্ষে এই পরিমাণ ছিল ৮১.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০’র এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্বে এই পরিমাণ বেড়ে ৫১.৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ভারতে নাইজারের রপ্তানির পরিমাণ ০.৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ডঃ জয়শঙ্করের টিউনিশিয়া সফরেও সেদেশে একটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উদ্ভাবন কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর টিউনিশিয়ার রাষ্ট্রপতি কাইস সৈয়েদ এবং সেদেশের বিদেশ মন্ত্রী সাবরি বাচতোবরির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রসারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন বহুপাক্ষিক মঞ্চে একযোগে কাজ করার বিষয়ে তাঁরা সম্মত হন। উল্লেখ্য, টিউনিশিয়ায় ফসফেটের বিপুল ভান্ডার রয়েছে। টিউনিশিয়ার মোট ফসফোরিক অ্যাসিড রপ্তানির ৫০ শতাংশই হয় ভারতে। ভারত টিউনিশিয় শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১০টি ICCR স্কলারশীপ দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছে।

২০১৭’য় নতুন দিল্লিতে টিউনিশিয়া-ভারত যৌথ কমিটির বৈঠকের প্রেক্ষিতে এই সফর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরো মজবুত করার লক্ষ্যে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে একযোগে কাজ করার কথা বলা হয়। উল্লেখ্য, ১৯৫৮ সালের পর উত্তর আফ্রিকী দেশসমূহে ভারতের কোনো পররাষ্ট্র মন্ত্রীর এটি দ্বিতীয় সরকারী সফর।

নাইজার এবং টিউনিশিয়া রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য এবং বিভিন্ন সময়ে নতুন দিল্লি এই দুই বন্ধু রাষ্ট্রের সমর্থন পেয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে এই সফর এই দুই রাষ্ট্রের প্রতি ভারতের সমর্থন ও কৃতজ্ঞতারই পরিচায়ক।



( মূল রচনাঃ ভিনীত ওয়াহি )

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?