ভারতের সংবিধানঃ দেশের সর্বোচ্চ আইন
সংবিধান সভার তিন বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ভারতের সংবিধান যখন কার্যকর হল, তখনও বিশ্লেষকরা সন্দিহান ছিলেন যে এই সংবিধান কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে।
এটি সংবিধান প্রণেতাদের দূরদর্শিতার পরিচয়। তাঁরা যা প্রণয়ন করেছিলেন তা অবিচল রয়েছে এবং তার ওপরেই ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্র অধিষ্ঠিত। ভারতীয় সংবিধান শুধুমাত্র সংবিধান রচয়িতাকারীদের জন্য নয়, সাধারণ নাগরিকদের জন্যও এক আলোক স্তম্ভ হিসেবে রয়েছে। সাত দশক পার করেও সংবিধানের মূল কাঠামোটি অপরিবর্তিত রয়েছে। বহু সংশোধনী সত্বেও ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় উল্লিখিত নীতিগুলি বজায় আছে; যা এই আস্থাকেই প্রতিফলিত করে যে সংবিধানের প্রতি ভারতের অটুট বিশ্বাস রয়েছে।
বিশ্বের সামনে ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, সাম্যতা এবং ভ্রাতৃত্বের নীতিগুলির ভিত্তিতে রচিত একটি সার্বভৌম, ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের জন্মলগ্নে সংবিধানের প্রস্তাবনায় শুরুতেই ছিল -“আমরা, ভারতের নাগরিকগণ” – এই কথাগুলি। এই সংবিধান শুধুমাত্র কোনো রাষ্ট্রের কাঠামো এবং প্রশাসন প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত আইনী দলিল নয়, বরং এটি নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতার সনদ।
প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন বস্তুতভাবে সংবিধান রচনার উৎসব হিসেবে উদযাপন করা হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে তার মূল গ্রথিত থাকায় তা সবসময়ই সজীব। ১৯৫০’এর ২৬শে জানুয়ারি ভারত প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। সংবিধানের প্রতি প্রতিটি ভারতবাসীর গভীর আস্থা ও বিশ্বাস থাকায় গত সাত দশকেরও বেশী সময়ে তা ক্রমশঃ মজবুত হয়েছে।
প্রতিবছর প্রজাতন্ত্র দিবসে রাজপথে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ দেশের সামরিক শৌর্যকেই যে শুধু তুলে ধরে তাই নয়, এই উপলক্ষ্যে ভারতবাসী দেশের সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। সংবিধান প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের স্বাধীনতা এবং অধিকারকে সুনিশ্চিত করে। এই দিনে প্রতিটি ভারতীয় নাগরিক দেশের প্রতি তাঁদের কর্তব্য এবং দায়িত্ব পালনেরও অঙ্গীকার করে। এজন্য এই সংবিধান দেশের প্রতিটি নাগরিকের এত প্রিয়।
মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ শাসনের হাত থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের সংবিধানের সূচনা হয়। গান্ধীজীর রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সংবিধানের প্রণেতা ডঃ বি আর আম্বেদকর অবহেলিত জনগণের সপক্ষে সামাজিক ন্যায় ও বিচারের প্রতিশ্রুতিকে সংবিধানে প্রাধান্য দেন।
সংবিধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো। ভারত একাধিক রাজ্যের সমষ্টি আর এর ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের ধারণা গড়ে ওঠে। উল্লিখিত ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হল, কেন্দ্র ঘেঁষা যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রশাসন। তবে ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো পাশ্চাত্যের বহু রাষ্ট্রের মতো অতিরিক্ত কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত নয়।
নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের বৈধতার এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে এই অধিকারের উল্লেখ করেছেন। একে ‘জীবনের অধিকার’ অর্থাৎ সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা , নাগরিকদের তথ্যের অধিকার এবং গোপনীয়তা বজায় রাখার অধিকার ভারতের গণতন্ত্রকে আরো মজবুত করেছে। বর্তমানে ভারতীয় গণতন্ত্র বিশ্বের অন্যান্য বহু গণতান্ত্রিক দেশের তুলনায় অনেক শক্তিশালী এবং পরিণত।
সংবিধান এই ভাবেই ভারতীয় জনগণের সম্মানদায়ক জীবনের মূল আধার হিসেবেই থাকবে। ভবিষ্যতেও নাগরিকদের সংবিধানের প্রতি আস্থা বজায় রাখতে হবে যাতে ভারতীয় গণতন্ত্রের স্বরূপ এইভাবেই শক্তিশালীভাবে বজায় থাকতে পারে।
(মূল রচনাঃ বলবীর অরোরা)
Comments
Post a Comment