৭১-তম সাধারণতন্ত্র দিবসে প্রধান রাষ্ট্রীয় অতিথি ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি

অতি শক্তিধর দেশগুলিকে বাদ দিলে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে চীনের পরেই ভারত ও ব্রাজিল এমন দুটি দেশ যাদের বিশ্ব রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনা আছে। তবে খুব বেশি দিনের কথা নয়, যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের প্রতিচ্ছবি ছিল দারিদ্র ও অনাহার পীড়িত, আর ব্রাজিলের পরিচয় ছিল চরম মুদ্রাস্ফীতি ও ঋণগ্রস্ত দেশ হিসেবে। সে কারণে এক সময় ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি দ্য গল ব্রাজিলকে অত্যন্ত পিছনের সারির দেশ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আর আজ,মজবুত গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থব্যাবস্থার দেশ ভারত ও ব্রাজিল,বিশ্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মঞ্চে নিজেদের আধিপত্য সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিগত প্রায় এক দশক সময়ে এই দুই দেশের পররাষ্ট্রনীতি, দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক মঞ্চে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসে এক মৌলিক ভূমিকা পালন করেছে। 

৭১-তম সাধারণতন্ত্র দিবস উদযাপনের সময়ে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি জ্যের মেশিয়া বলসোনারো’র চার দিনের ভারত সফর ও সাধারণতন্ত্র দিবসের মূল অনুষ্ঠানে প্রধান রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে তাঁর উপস্থিতি দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কে ক্রমবর্দ্ধমান ঘনিষ্ঠতাই সূচিত করছে। মেশিয়া বলসোনারো হলেন ব্রাজিলের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি যিনি সাধারণতন্ত্র দিবসের মূল অনুষ্ঠানে প্রধান রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতে আমন্ত্রিত হলেন। এর আগে ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রপতি ফার্নানদো হেনরিক কারডোসো ও ২০০৪ সালে রাষ্ট্রপতি লুই ইনাসিও দ্য সিলভা লুলা এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি রূপে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন।

উল্লেখ করা যেতে পারে, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে এন ডি এ সরকার ক্ষমতায় আসবার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দু বার ব্রাজিল সফর করেছেন। ২০১৪ সালে ব্রাজিলের ফোর্টাজেলায় ও ২০১৯’এ সে দেশের ব্রাসিলিয়ায় ব্রিক্স শিখর সম্মেলনে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। 

ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও সফররত রাষ্ট্রপতি নতুন দিল্লিতে দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থজড়িত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। সফররত রাষ্ট্রপতির সম্মানে রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ ভোজসভার আয়োজন করেন। দুটি দেশ দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ সহযোগিতা ও সন্ত্রাস দমন সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১৫ টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। রাষ্ট্রপতি বলসোনারো ভারত-ব্রাজিল ব্যবসায়ী মঞ্চের সভায় ভাষণ দিয়েছেন ও তাঁর সঙ্গে এ দেশে আগত সাত মন্ত্রী, ভারতের সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের সাত মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। 

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছিলেন, বলসোনারো ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবার পর ব্রিক্স দেশগোষ্ঠীর গুরুত্ব কমবে ও দেশটির পররাষ্ট্র নীতিতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলি বেশি প্রাধান্য পাবে। তবে এই অনুমানকে ভ্রান্ত প্রমাণিত কোরে বলসোনারো ক্ষমতায় আসবার কয়েক মাসের মধ্যেই ব্রিক্স শিখর সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। ইতিমধ্যে তিনি চীনও সফর করেছেন। কৌশলগত অংশীদার দেশ হিসেবে ভারত ও ব্রাজিল বর্তমানের বহু শক্তি কেন্দ্রিক বিশ্ব প্রেক্ষাপটে তাদের বিদেশ নীতিতে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত বিষয়গুলি নির্ধারণ করেছে। 

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ভারত - ব্রাজিলের সম্পর্কের অন্যতম মাধ্যম। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে আনুমানিক ৮২০ কোটি মার্কিন ডলার মাত্রায় পৌঁছেছে। ওই দেশে ভারতের রপ্তানির পরিমাণ এখন প্রায় ৩৮০ কোটি মার্কিন ডলার। বিগত বছরগুলিতে ব্রাজিলে ভারতীয় বিনিয়োগ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিনিয়োগ প্রধানত তথ্য প্রযুক্তি, ওষুধ শিল্প, কৃষি ভিত্তিক ব্যবসা, তেজঃশক্তি, খনি ও ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষেত্রে। দুটি দেশ কৌশলগত অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে একটি কর্ম পরিকল্পনা রচনা করেছে,যা প্রযুক্তি বিনিময়, প্রতিরক্ষা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে বর্ধিত সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে। 

BRICS,G-20 ও IBSA’র মত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত ও ব্রাজিলের অংশগ্রহণ ছাড়াও দুটি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্তরে নিয়মিত যোগাযোগের ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উত্তরোত্তর মজবুত হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মঞ্চে দুটি দেশ এখন তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ৭১-তম সাধারণতন্ত্র দিবসে প্রধান রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি বলসোনারো’র উপস্থিতি ভারত-ব্রাজিল সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে বলেই আশা করা যায়। ( মূল রচনাঃ- ডঃ আশ নারায়ণ রায়)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?