JCPOA থেকে ইরানের প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ইরাণের জেনারেল কাসেম সোলেমানি নিহত হওয়া এবং তার পরবর্তী ঘটনাবলীর পর সর্বশেষ পরিস্থিতি হল ইরান হুমকি দিয়ে বলেছে যে ইওরোপীয় ইউনিয়ন যদি ইরাণের পরমাণূ প্রশ্নটি রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাছে উত্থাপন করে তবে তারা পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাবে। জেনারেল সোলেমানির হত্যার পর এটা হল সবচেয়ে বড় প্রভাব যা অন্য সব ছাপিয়ে উঠেছে, কারণ এর পরিণতি হতে পারে সুদূর প্রসারী। আন্তর্জাতিক অস্ত্র প্রসার রোধ চুক্তির ওপর এবং এই অঞ্চলের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। যৌথ সর্বাত্মক কর্ম পরিকল্পনা JCPOA যা ইরান পরমাণু চুক্তি বলে অধিক পরিচিত তার কোনো শর্তাদি আর মানা হবে না বলে ইরান সরকার সিদ্ধান্ত নেবার পর এন পি টি থেকে প্রত্যাহারের এই হুমকি।
ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানী সহ তিনটি দেশের গোষ্ঠী পরমাণূ চুক্তিতে বিবাদ নিস্পত্তি ব্যবস্থাপনা ডি আর এম এর যে সংস্থান রেখেছে তার প্রতিক্রিয়ায় এন পি টি থেকে প্রত্যাহারের বিষয়ে ইরান এই ঘোষণা করে। আসল কথা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই পথ বেছে নিতে ইওরোপীয় দেশগুলিকে চাপ দেয়। ইওরোপীয় দেশগুলির ওপর অনবরত এই ধরণের চাপের ফলে JCPOA থেকে ইরান প্রকৃতই প্রত্যাহার করে নেওয়ার পথই হয়তো বেছে নেবে।
ডি আর এম বলবৎ করা এবং রাষ্ট্রসংঘ নিরাত্তা পরিষদে অনবরত চাপ দেওয়ার ফলে ইরাণের ওপর পুনরায় রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের শাস্তিব্য বস্থা নেমে আসতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক তরফা নিশেধাজ্ঞা আরোপের পরিণতি হসেবে ইরান আগে থেকেই অর্থনৈতিক দুর্ভোগের শিকার। উপরন্তু এই ব্যবস্থার ফলে অভ্যন্তরীণ অশান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। অতিরিক্ত বহুজাতিক শাস্তি ব্যবস্থা আরোপের ফলে আরো বেশি অভ্যন্তরীন অশান্তি দেখা দেবার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে এই ইস্লামিক রাষ্ট্রে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধতে পারে এবং ইরান সরকার এই ধরণের প্রতিবাদের মোকাবিলায় হিংসাত্মক পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
ইরাণ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমান দ্বন্দ্বের কারণ হল ২০১৮র ৮ মে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের JCPOA থেকে একতরফা প্রত্যাহার। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা, ইরান, চুক্তিতে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করছে বলে নিয়মিত স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া সত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রত্যাহার। বস্তুত পক্ষে মার্কিন প্রত্যাহারের পর ইরাণ এই আশায় এক বছর অপেক্ষা করেছে যে ইওরোপীয় দেশগুলি কিছু একট সমাধান খুঁজে বার করবে। কিন্তু তা না হওয়ায় ইরাণ ২০১৯ এর ৮ মে ঘোষণা করে যে JCPOA প্রতিশ্রুতি থেকে তারা নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছে।
JCPOAর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ইরাণের ইউরেনিয়াম সম্মৃদ্ধকরণের গতি মন্থর করা। তবে এই চুক্তি থেকে ইরাণের প্রত্যাহারের ফলে ইরান আরো দ্রুত গতিতে এই কাজ সম্পন্ন করবে। JCPOAর অন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল ইরাণের পরমাণু কর্মসূচির স্বচ্ছতা এবং সেই কারণেই তাদের এই চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের ফলে অন্য দেশগুলি ইরাণের পরমাণূ কর্মসূচির প্রকৃত ধরণ এবং অগ্রগতি সম্পর্কে কিছুই জানতে পারবে না।
ইরাণের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্ব্বী সৌদি আরবও একই পথ অনুসরণ করবে ফলে মধ্য প্রাচ্যের অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরো বৃদ্ধি পাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইস্রায়েলের মত ইরাণের পরমাণু কর্মসূচির বিরোধী দেশগুলি ইরাণের পরমাণূ প্রতিষ্ঠানগুলিতে সামরিক হানা দিতে পারে। ফলে বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে যুদ্ধের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ওপর নেতীবাচক প্রভাব ফেলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
ইরাণের বিদেশ মন্ত্রী মহম্মদ জাভেদ জারিফ গত সপ্তাহে নতুন দিল্লী সফর করে গেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিদেশ মন্ত্রী ড. এস জয়সংকরের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। নতুন দিল্লী পারস্য উপসাগরে শান্তি স্থাপনের আগ্রহ ব্যক্ত করেছে।
ইরাণের রাষ্ট্রপতির কার্যলয়ের প্রধান মহম্মদ ভায়েজি সাম্প্রতিক বিবৃতিতে ইরাণ এবং সৌদি আরবকে এক সঙ্গে কাজ করার যে কথা বলেছেন তা উৎসাহজনক। পারস্য উপসাগরের দেশগুলির সর্বোতভাবে উচিত এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য এক সঙ্গে কাজ করা। শান্তি এবং স্থিতিশীলতা এবং সম্ভাব্য অস্ত্রবিস্তার রোধের জন্য এটি একান্ত প্রয়োজন। এই অঞ্চলের দুটি দেশ তাদের পারস্পরিক মতপার্থক্য মিটিয়ে নিতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ বেছে নেবে বলে আশা করা অসংগত নয়। (মূল রচনাঃ ড. আসিফ শুজা)
Comments
Post a Comment