ইমরান খানের রিয়াসত-এ-মদিনা গড়ে তোলার অলীক স্বপ্ন

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাঁর ‘নয়া পাকিস্তান’ স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁর দেশের একটি নতুন চিত্র বাস্তবায়িত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যা হবে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, তিনি পাকিস্তানকে মদিনার আদলে এবং নবির নীতিমালার নির্ভর একটি ইসলামপন্থী কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসাবে রূপান্তরিত করার অঙ্গীকার করেছিলেন। বিপর্যস্ত অর্থনীতি, সহযোগীদের জোট সরকার ত্যাগ, দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং ফিনানশিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স - এফএ টি এফ’এর কালো তালিকাভুক্তির ভয় এবং তাঁর দলের ক্ষমতায় থাকার দ্বিতীয় বছর সম্পূর্ণ হওয়ার সময়ে পিটিআই সরকারের অর্থনৈতিক অবস্থা কোনোটাই উৎসাহব্যঞ্জক নয়। 

তাঁর সরকারের দ্বিতীয় বছরপূর্তীতে ইমরান খান গত দু' বছরে তাঁর সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরতে একাধিক টেলিভিশন স্টুডিও’র দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁর মতে, বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের লক্ষ্যে তাঁর পদক্ষেপের পাশাপাশি করোনা অতিমারির সময় তাঁদের প্রয়াস তার সরকারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাফল্য। ইমরান খানের মত অনুসারে যে জন্য এই দেশটি মূলত সৃষ্টি হয়েছিল, পাকিস্তানকে সেই কল্যাণমুলক ইসলামী রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। এক সাক্ষাত্কারে ইমরান বলেন, তিনি রিয়াসাত-এ-মদিনার মতোই পাকিস্তানকে ইসলামী বিশ্বের সামনে একটি উদাহরণ হিসেবে তৈরি করতে চান। 

পাকিস্তান সরকার দেশের মাদ্রাসাগুলিকেীকটি ধারায় আনার লক্ষ্যে বিতর্কিত একক জাতীয় পাঠ্যক্রম নীতি -এসএনসিপি চালু করেছে। এর আওতায় পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের দীন-ইয়াত (ইসলাম সংক্রান্ত ধর্মীয় গ্রন্থ) পড়া বাধ্যতামূলক করেছে। এ ছাড়াও অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণীর পাঠ্যসূচিতে নবির জীবন ও ইতিহাস সংক্রান্ত একটি অধ্যায় চালু করেছে যাতে ছাত্ররা তার জীবন থেকে পাঠ নিতে পারে। এসএনসিপি-র সমালোচকদের কাছে এটি শিক্ষামুলক নয় বরং আদর্শগত। তাঁদের মতে অতি অল্প বয়সের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি অতিরিক্ত। পাকিস্তানের শিক্ষাবিদদের মতে এর ফলে মূলধারার মূলধারার শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে মাদ্রাসাগুলির দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। এছাড়াও লক্ষ্যণীয় এই মুহূর্তে ইমরান খান সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথোপকথনে ইসলামিক রাষ্ট্র সম্পর্কে বেশি কথা বলেছেন। 

বিশিষ্ট পাকিস্তানি শিক্ষানবিশ পারভেজ হুডভয় বলেন, এই নতুন পাঠ্যক্রমটি কোনওভাবেই স্কুল শিশুদের মধ্যে সমতা আনতে পারবে না। তিনি বলেন, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এটি অতিরিক্ত চাপ। শুধু তাই নয়, তাদের কোরান, তার অনুবাদ এবং দুয়া বা নামাজও শিখতে হবে। এই এতো ধর্মীয় পাঠের পর তাদের জন্য অন্যান্য বিষয়গুলি পড়ার সময় কোথায় থাকবে সে বিষয়ে হুডিভয় প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, মাদ্রাসাগুলি পরকালের জন্য প্রস্তুত করে এবং স্কুলগুলির কাজ এই জীবনের জন্য তরুণ মনকে প্রস্তুত করা। সু তরাং এই দুটিকে কীভাবে একত্রিত করা সম্ভব? নতুন পাঠক্রমটি তৈরিতে নিযুক্ত চারশো বিশেষজ্ঞের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। এছাড়াও এই নতুন ব্যবস্থায় নতুন নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন প্রচুর সংখ্যক গ্রন্থ নিষিদ্ধ করার জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। 

গত দুই বছরে পিটিআই সরকারের কাজ সংক্রান্ত সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৫৫% পাকিস্তানি মনে করেন যে বর্তমান সরকার এই দুই বছরে ব্যর্থ হয়েছে। এই খারাপ ফলাফলের পাঁচটি প্রধান সূচক হল - বর্ধিত মূদ্রাস্ফীতি,বেকারত্ব, সঠিক মন্ত্রিসভা নির্বাচন না করতে পারা , দুর্নীতি এবং প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সম্পূর্ণ উল্টো মুখী হওয়া। ইমরান খান ‘নয়া’ পাকিস্তান গড়তে নতুন প্রতিভা নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। 

বহু বছর ধরে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা জাতীয় সুরক্ষা এবং বিদেশ নীতি নির্ধারক হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। পিটিআই সরকারের সময় এই ভূমিকা আরও সুস্পষ্ট হয়েছে বলে মনে হয়। সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল কামার বাজওয়া বহুবার প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তাঁর মন্ত্রীসভার আবেগমূলক সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের মুখ রক্ষায় সহায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ওআইসিতে শাহ মেহমুদ কোরেশির বক্তব্যের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁর সাম্প্রতিক সৌদি আরব সফর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এমনকি কোভিড ১৯ অতিমারি নিয়ন্ত্রণেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় সমন্বয় কমিটির – এনসিসি’র চেয়ে সেনাবাহিনীর ন্যাশনাল কমান্ড অ্যান্ড অপারেশন সেন্টার-এনসিওসি, বেশী সফল বলে মনে করা হয়। 

খবরে জানা যাচ্ছে যে, পিটিআই সরকারের মন্ত্রিসভায় বিভেদ দেখা দিয়েছে। বহু সদস্য ইমরানের ইসলামিক কল্যাণমুলক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য পূরণের বিষয়ে একমত নন। আপোষ করতে অনাগ্রহী বিরোধী, দূর্বল অর্থনীতি এবং এফএটিএফের কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার আশঙ্কার প্রেক্ষিতে ইমরান খান বাকী সদস্যদের রিয়াসাত- এ- মদীনা গড়ার ক্ষেতত্রে কিভাবে কাজে লাগাবেন না প্রকৃত পরিস্থিতি অনুধাবন করে সচেতন হবেন, তাই দেখার বিষয়। 

( মূল রচনাঃ ডঃ জয়নাব আখতার)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?