প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রসংঘ সংস্কারের আহ্বান



প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ২২শে সেপ্টেম্বর ২০২০তে রাষ্ট্রসংঘের ৭৫তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত শিখর সম্মেলনে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে তাঁর ভাষণে রাষ্ট্রসংঘের মূল লক্ষ্যটি অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন এবং রাষ্ট্রসংঘের ভবিষ্যত রূপরেখা নিয়ে তাঁর ভাবনা চিন্তার কথা তুলে ধরেন। এতে শান্তি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গির মূল কথাটি হল, পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৪৫ সালে যে ভাবনা চিন্তার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রসংঘ তৈরি হয়েছিল, গত ৭৫ বছরে তাতে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসাবে ভারত ‘এই মহান প্রতিষ্ঠানের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে’ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে, এর পাশাপাশি অতীতকালের সঙ্গে একবিংশ শতাব্দীর প্রয়োজনীয়তা এবং চ্যালেঞ্জগুলি সম্পূর্ণ আলাদা বলেও তিনি উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রসংঘের প্রতিটা ক্ষেত্রের জন্য সংস্কারই হল মূল আবশ্যক।

এই সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দু রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, গৃহযুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ রোধে এর ব্যর্থতার ফলে বহু শিশু সহ সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অসংখ্য ছিন্নমূল মানুষ গৃহহীন শরণার্থীতে পরিণত হয়েছেন।

শ্রী মোদি বলেন, ভারতের ১.৩ বিলিয়ন মানুষ এই সংস্কার কার্যকর হওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছে। এই সংস্কারগুলির যৌক্তিক উপসংহারটি হল, রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যবস্থাপনায় ভারতের অন্তর্ভূক্তি।

পরিষদে ভারতের স্থায়ী উপস্থিতির ফলে বিশ্বের ১৮% জনসংখ্যা বিশিষ্ট বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে রাষ্ট্রসংঘ উপকৃত হতে পারবে। ভারতের ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’এর আদর্শ, একটি পরিবার হিসাবে রাষ্ট্রসংঘের ভাবনাকে আরো মজবুত করবে।

প্রধানমন্ত্রী ২রা অক্টোবর আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস এবং ২১শে জুন আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উদযাপন, বিপর্যয় মোকাবিলা সংক্রান্ত জোট, আন্তর্জাতিক সৌর জোট এবং মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে শান্তি ও ভারসাম্য আরো মজবুত করার জন্য ভারতের প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার ওপর আলোকপাত করেন।

কোভিড -১৯ প্রসঙ্গে তিনি জানান, এই অতিমারীর মোকাবিলায় ভারত ১৫০টিরও বেশি দেশে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাঠিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকে আশ্বাস দেন যে, ভারতের প্রতিষেধক উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষমতা বিশ্বের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

ভারত অতিমারী পরবর্তী সময়ে একটি "আত্মনির্ভর ভারত" গড়ে তোলার কথা ঘোষণা করেছে যা বিশ্ব অর্থনীতির শক্তি হবে। প্রধানমন্ত্রী মোদি গত পাঁচ বছরে ভারতে যে "যুগান্তকারী পরিবর্তনসমূহ" হয়েছে তার কথা তুলে ধরেন। এই পরিবর্তনগুলির দরুণ বিপুল সংখ্যক মানুষের পক্ষে অর্থনীতির মূল বৃত্তে অন্তর্ভূক্ত হওয়া, উন্মুক্ত মলমূত্রত্যাগ বন্ধ করার ব্যবস্থাদি এবং বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়া সম্ভব হয়েছে। স্বউদ্যোগে উৎসাহদান, মাইক্রো ফিনান্সিংএ অংশগ্রহণ এবং বেতন সহ মাতৃত্বকালীন ছুটির মাধ্যমে মহিলাদের ক্ষমতায়ন ভারতের বৈষম্যহীন উন্নয়ন নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রধানমন্ত্রী জানান, ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে ভারত শীর্ষ দেশগুলির অন্যতম, তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে ভারত কখনও তার উন্নয়নের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে দ্বিধা করেনি।

প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রসংঘের বৃহত্তর ভূমিকার ক্ষেত্রে ভারতের অবদানের উপর গুরুত্ব দেন। বিশ্ব শান্তি বজায় রাখতে নিরাপত্তা পরিষদের ৫০টি শান্তিরক্ষা কর্মকান্ডে শান্তিরক্ষী বাহিনী হিসেবে মোতায়েন থাকাকালীন শহীদ সেনানিদের মধ্যে ভারতের বীর সেনাদের সংখ্যা সর্বাধিক। পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে ভারতের ‘প্রতিবেশী সর্বাগ্রে’ নীতি, ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি, ‘সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সকলের জন্য সুরক্ষা ও বিকাশ’এর ধারণা এবং ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগর সম্পর্কিত নীতি, বিশ্বশান্তি ও সহযোগিতার প্রতি ভারতের প্রতিশ্রুতিবদ্ধতারই পরিচায়ক।

আগামী বছর জানুয়ারী থেকে রাষ্ট্রসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতকে নির্বাচন করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত তার সমৃদ্ধ উন্নয়নমূলক অভিজ্ঞতা সমগ্র বিশ্বের জন্য তুলে ধরবে। বিশ্ব কল্যাণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় - রাষ্ট্রসংঘের স্থিতিশীলতা ও ক্ষমতায়নের প্রয়াস, এর ফলে জোরদার হবে।

(মূল রচনা – অশোক কুমার মুখার্জি)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?