জনগণতান্ত্রিক আন্দোলন ও ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স - পাকিস্তান সরকার সংকটে
ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সরকার সংকটময় পরিস্থিতে। একদিকে ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের (এফএটিএফ) ভার্চুয়াল পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসবাদে অর্থ সহায়তা দেওয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বিশ্বব্যাপী অঙ্গীকার ও মান পূরণের জন্য ইসলামাবাদের গৃহীত পদক্ষেপ পর্যালোচনার ভিত্তিতে পাকিস্তানকে তার "ধূসর" তালিকায় রাখা হবে কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। একই সঙ্গে, জেইউআই-এফ প্রধান মাওলানা ফজল-উর-রেহমানের নেতৃত্বে সদ্য গঠিত পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (পিডিএম) পতাকার তলায় বিরোধী দলগুলির জোট হওয়ায় সেদেশে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এই বিরোধী জোট গুজরানওয়ালা এবং করাচিতে সফলভাবে দুটি সরকার-বিরোধী বিক্ষোভের আয়োজন করেছিল এবং রবিবার কোয়েটায় তৃতীয়টির আয়োজনের কথা রয়েছে।
ইমরান খান সরকার এফএটিএফ-এর সংস্থানগুলি রূপায়ন সম্পর্কিত একাধিক বিল এবং আইন আনে। কিন্তু, জাতীয় পরিষদে এগুলি তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হওয়ায় বিলগুলি আটকে যায়। এফএটিএফ সম্পর্কিত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল - সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইন (সংশোধনী) বিল, ২০২০, অর্থ পাচার প্রতিরোধ (দ্বিতীয় সংশোধনী) বিল এবং ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল ওয়াকফ সম্পত্তি বিল, গত ১৬ই সেপ্টেম্বর বিরোধীদের বিক্ষোভ ও ওয়াক-আউটের মধ্যে সংসদের যৌথ অধিবেশনে পাস হয়েছিল। এফএটিএফ-সম্পর্কিত বিলগুলি ব্লক করার বিরোধী দলের পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বিরোধী দলগুলির প্রতি আক্রমণ শানিয়ে একাধিক টুইটে বলেন যে তারা তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলির হাত থেকে বাঁচতে গুরুত্বপূর্ণ এফএটিএফ বিলগুলি অবরুদ্ধ করে তাঁর সরকারকে "ব্ল্যাকমেইল" করছে।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের ভার্চুয়াল বক্তৃতায় পিটিআই সরকার ফেলে দেওয়ার পিছনে সমরিক বাহিনীর হাত ছিল বলে স্পষ্ট অভিযোগ উঠে আসে। রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে নওয়াজ শরীফ এবং আরও অনেক বিরোধী নেতার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়। যদিও এই নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হতে থাকায় নওয়াজ শরীফ ছাড়া অন্যান্য নেতার বিরুদ্ধে এফআইআর প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। নওয়াজ শরীফের বিরুদ্ধে এফআইআর প্রত্যাহার না করার কারণ হিসেবে জনানো হয় যে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী প্রতিবেশী ভারতের নীতিগুলিকে সমর্থন করেছেন যাতে পাকিস্তান, ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের (এফএটিএফ) ‘ধূসর তালিকা’য় বহাল থাকে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসবাদে অর্থ সহায়তা বন্ধ করতে তারা যথেষ্ট কাজ করেছে এবং এফএটিএফকে এ সম্পর্কে জানিয়েছে! অবশ্য কোনো কিছু দিয়েই সত্যকে ঢাকা যেতে পারে না।
গুজরানওয়ালায় নওয়াজ শরীফের ভার্চুয়াল ভাষণে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের চেয়রম্যান জেনারেল অসীম সালেম বাজওয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির ঘটনা তুলে ধরা হয়েছিল। পরে বাজওয়া তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক পাক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী পদ থেকে পদত্যাগ করেন। রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার জন্য পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনীর উপর ধারাবাহিকভাবে চাপ সৃষ্টির ফলে সেনাবাহিনী রাজনৈতিক বিষয় থেকে দূরে থাকার সরকারী বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়। ইমরান খান বিরোধীদের উপর আক্রমণ তীব্রতর করে বলেন যে এখন পাকিস্তান এক “নতুন ইমরান খান”-কে দেখতে পাবে। তিনি বলেন নওয়াজ শরীফকে পাকিস্তানে ফিরিয়ে এনে কারাগারে রাখাই তার অগ্রাধিকার হবে।
আদতে অভ্যন্তরীণ মন্ত্রকের অধীনে কর্মরত সিন্ধু রেঞ্জারদের হাতে পিএমএল-এন-এর ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) সাফদারের গ্রেপ্তার আর একটি রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে যাতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও জড়িত। যদিও তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন; প্রকাশিত হয়েছে যে সিন্ধু প্রদেশ পুলিশের আইজি-কে ফেডারেল সরকারের নির্দেশেই অপহরণ করা হয় এবং ক্যাপ্টেন সাফদারের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সই করতে বাধ্য হয়! সিন্ধু প্রদেশ পুলিশের আইজি সহ অনেক সিনিয়র পুলিশ অফিসার গণ-ছুটিতে গিয়ে বলেন যে তারা এই ঘটনায় অপমানিত হয়েছেন এবং পুলিশের আইজি অপহরণের তদন্ত হওয়া উচিত। সিন্ধু প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আরও একটি অভিযোগ এনে বলেন যে তিনি একজন ফেডারেল মন্ত্রীর কাছ থেকে হুমকি পেয়েছেন যে পিএমএল-এন নেতা ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) সাফদারের বিরুদ্ধে মামলা না করা হলে তাঁর সরকারকে "বরখাস্ত" করা হবে।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল কমর বাজওয়া সিন্ধু প্রদেশের কর্পস কমান্ডারকে এই ঘটনার তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সিন্ধু পুলিশ বাহিনীকে কাজে যোগ দিতে বলেছেন।
স্পষ্টতই উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলন ছাতার তলায় আসা বিরোধী জোটের মধ্যে একটি ভাঙন তৈরি করা। একটি প্রদেশের আইন বলবৎকারী সংস্থার প্রধানকে অপহরণ করার জন্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, দেশের আধা-সামরিক বাহিনীক অবৈধভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিক্ষোভের ফলে যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সঙ্কট উদ্ভূত হয়েছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সরকারের ভবিষ্যতের পক্ষে তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
[মুল রচনা –জাইনাব আখতার]
Comments
Post a Comment