পাকিস্তান এফএটিএফ’এর ধূসর তালিকায় থাকবে

গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স – এফএটিএফ’এর পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানকে “ধূসর তালিকায়” রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘ চিহ্নিত ব্যক্তি ও সংস্থার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে পাকিস্তানের বারবার ব্যর্থতার প্রেক্ষিতেই তা হয়। পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির সঙ্গে তাদের দীর্ঘস্থায়ী সংযোগের অবসান ঘটাতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। এই সব অবাধে কর্মকান্ড চালানো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলিকে পাকিস্তান রাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেছে এবং অর্থ প্রদান করেছে। এদের পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসবাদে অর্থ যোগান ও অর্থ পাচারের একটি সক্রিয় নেটওয়ার্ক গভীরভাবে শিকড় ছড়িয়েছে। 

প্যারিসভিত্তিক এফএটিএফ’এর পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের শেষে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল সাংবাদিক সম্মেলনে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এই আন্তর্জাতিক সংস্থা এর আগে ২৭ দফা শর্ত রেখেছিল যার মধ্যে পাকিস্তান ২১টি পূরণ করতে সক্ষম হয়। এর ফলেই পাকিস্তান ধূসর তালিকাভূক্ত হয়েছে এবং যতক্ষণ না পাকিস্তান তাদের ভাবমূর্তি উন্নত করতে পারে ততদিন ঐ তালিকাই বজায় থাকবে। এফএটিএফের প্রধান মার্কাস প্লিয়ার বলেন, যে এ ক্ষেত্রে কিছুটা "অগ্রগতি" হলেও পাকিস্তানকে এখনও "আরও বেশী কিছু করতে হবে"। পাকিস্তানের পক্ষে দ্বিগুণ সমস্যা হল, ধূসর তালিকার কারণে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলির সহায়তা পাওয়া থেকে তাদের বঞ্চিত থাকতে হবে। 

১৯৮৯ সালে গঠিত ৩৯ সদস্য বিশিষ্ট এফএটিএফ হল একটি বিশ্বব্যাপী সংস্থা যা সন্ত্রাসবাদে অর্থ যোগান ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। ভারত এফএটিএফ’এর সদস্য এবং তার আঞ্চলিক সহযোগী সংস্থা এশিয়া প্যাসিফিক গোষ্ঠীরও একটি অংশ, যা পাকিস্তানের বিষয়টি দেখছে। উল্লেখ্য, ভারত সক্রিয়ভাবে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে পাকিস্তানের বহুবছরের জোট এবং উপমহাদেশে এই সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলির কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়কে অবগত করছে। 

পাকিস্তান ক্রমাগত শুধুমাত্র ভারতের বিরুদ্ধে নয়, পার্শ্ববর্তী অঞ্চল বিশেষত আফগানিস্তানেও রাষ্ট্রীয় নীতির হাতিয়ার হিসাবে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করেছে। সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলিকে পাকিস্তানের সমর্থনদানের ফলে আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা স্থাপনের লক্ষ্যে জোট বাহিনীর প্রচেষ্টাও ব্যহত হয়েছে। এই কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানি এবং ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী দেশগুলি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলিকে চিহ্নিত করা বা তাদের তহবিল বন্ধ করতে পাকিস্তানের প্রবল অনীহা সম্পর্কে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। এই কারণেই সন্ত্রাসবাদী তহবিল এবং সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সন্দেহজনক ভূমিকা নিয়ে এফএটিএফ’এর সদস্যদেশগুলির মধ্যে একটি ঐকমত্য রয়েছে। সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে পাকিস্তান চীন, তুরস্ক ও মালয়েশিয়া এই তিনটি মাত্র দেশের সমর্থন পেয়েছিল। তাদের সমর্থনের ফলেই, পাকিস্তানের কালো তালিকাভূক্ত হয় নি। 

পাকিস্তান জুন ২০১৮ সালে ধূসর তালিকাভুক্ত হয় এবং সন্ত্রাস তহবিলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ইসলামাবাদকে একটি ২৭ দফা কর্মপরিকল্পনা দেওয়া হয় যা ২০১৯ সালের অক্টোবরের মধ্যে সম্পূর্ণ করার প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান ২০২০’র ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ঐ ২৭দফা কর্মপরিকল্পনার মধ্যে মাত্র ১৩টির বিষয়ে কাজ করতে পেরেছে বলে জানা গেছে। জুন ২০২০র পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের আগেই তা সম্পূর্ণ করার জন্য আরও ৪ মাসের বাড়তি সময়সীমা পাকিস্তানকে দেওয়া হয়। তবে কোভিড -১৯ অতিমারীর কারণে ঐ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন স্থগিত হয়ে যায় এবং এর ফলেই পাকিস্তান আরো ৪ মাসের বাড়তি সময় পেয়ে যায়। এই পর্বে এফএটিএফ পারস্পরিক পর্যালোচনা প্রক্রিয়াগুলিও স্থগিত রাখে। তবে এই বর্ধিত সময়সীমা সত্ত্বেও, পাকিস্তান এফএটিএফ’এর শর্ত পূরণে ব্যর্থ। সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করা পাকিস্তানের ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলিতে এতটাই গভীরে প্রথিত যে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের এই ব্যবস্থা পরিবর্তনের উদ্বেগ জড়িত প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। এদিকে এফএটিএফ-এর কারণ অনুসন্ধানকারী দল ঐ ২৭টি শর্ত পূরণের পরেই বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য পাকিস্তান পরিদর্শন করবে। 

পাকিস্তানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল - আইএমএফ সম্প্রতি পাকিস্তানের ঐ আর্থিক ঘাটতিগুলি পূরণের লক্ষ্যে একটি ঋণদান প্রক্রিয়া মঞ্জুর করেছে তবে তারা এর জন্য পাকিস্তান সরকারের সামনে কঠোর শর্তও প্রদান করেছে। এর ফলে ইমরান খানকে একাধারে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা এবং অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষ্যে আন্তরিকভাবে কাজ করার প্রয়াস অব্যহত রাখার মধ্যে একটি অনিশ্চিত ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছেন। পাকিস্তান যদি আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলির কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশা করে, তবে একমাত্র উপায় হল, তাদের গোচরে থাকা সন্ত্রাসে অর্থ যোগানকারী সমস্ত মাধ্যম এবং তাদের উত্সগুলিকে পুরোপুরিভাবে বন্ধ করা। 

(মূল রচনা – ডঃ প্রিয়াঙ্কা সিং)

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?