ভারত-মেক্সিকো যৌথ কমিশনের বৈঠক
খ্যাতনামা মেক্সিকান লেখক এবং নোবেল বিজয়ী অ্ক্টাভিও পাজ তাঁর ‘ইন লাইট অফ ইন্ডিয়া’ বইয়ে ভারত এবং মেক্সিকোর সাদৃশ্য ও পার্থক্য এবং দুটি দেশকে একত্রিত ও পৃথক করেছে এমন বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলি সম্পর্কে লিখেছেন। ৬০’এর দশকে ভারতে মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত পাজ বলেন, “ভারতীয়রা অন্যদের থেকে তাদের পার্থক্যের বিষয়ে খুব সচেতন। মেক্সিকানদেরও এই একই মনোভাব রয়েছে”। তিনি আরও বলেন, "ভারতীয় হওয়ার অর্থ কী তা আমি বুঝতে পারি কারণ আমি একজন মেক্সিকান।" উল্লেখ্য, পাজ সেই কয়েকজন পশ্চিমী বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম যিনি ভারত, তার সংস্কৃতি এবং নীতিগুলি অনুধাবন করতে পেরেছেন এবং এক অর্থে পশ্চিমের কাছে ভারতের দূত হয়ে উঠেছেন।
এই বছর ভারত ও মেক্সিকো তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ৭০তম বর্ষ উদযাপন করছে। এমন এক সময়ে যখন ভারতীয় বিনিয়োগকারী এবং নীতিনির্ধারকরা লাতিন আমেরিকার দিকে ঝুঁকছেন, তখন এই অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার হিসেবে মেক্সিকোর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটেই গত ২৯শে অক্টোবর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত অষ্টম ভারত-মেক্সিকো যৌথ কমিশনের বৈঠকটির তাৎপর্য বুঝতে হবে। বৈঠকে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ এস জয়শঙ্কর এবং মেক্সিকোর বিদেশমন্ত্রী মার্সেলো ইব্রার্দ। গত অর্থবছরে উভয় দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ভারতে মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত শ্রী ফেদারিকো সালাস বলেন, লাতিন আমেরিকার দেশগুলির মধ্যে মেক্সিকোই ভারতের প্রথম বাণিজ্য সহযোগী। ভারতও মেক্সিকোর প্রথম দশটি বাণিজ্যিক সহযোগীর অন্যতম হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। উভয় দেশই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। সুখের বিষয়, উভয় দেশই তাদের সম্পর্ককে “বিশেষ অংশীদারিত্ব" থেকে “কৌশলগত অংশীদারিত্বে” এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে একযোগে প্রয়াস নিচ্ছে।
ভারত ও মেক্সিকোর মধ্যে সম্পর্কের একটি ইতিবাচক দিক হল, বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থাপনাগুলির নিয়মিত বৈঠক, যার মধ্যে রয়েছে, একটি যৌথ কমিশন এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্পর্কিত একটি উচ্চ পর্যায়ের গ্রুপ। এগুলির মাধ্যমে বিনিয়োগ, প্রচার ও সুরক্ষা, দ্বৈত কর এড়ানো, বিমান পরিষেবা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষিক চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত মাসে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বিষয়ক ভারত-মেক্সিকো দ্বিপাক্ষিক উচ্চ-পর্যায়ের গ্রুপ - বিএইচএলজি’র পঞ্চম বৈঠক হয়। বাণিজ্য সচিব অনুপ ওয়াধওয়ান এবং মেক্সিকোর বৈদেশিক বাণিজ্য সংক্রান্ত উপমন্ত্রী লুজ মারিয়া দে লা মোরা যৌথভাবে এই বৈঠকে পৌরহিত্য করেন।
ভারত ও মেক্সিকো উভয়ই বহুপাক্ষিকতার পক্ষে এবং এই লক্ষ্যে রাষ্ট্রসংঘ ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক মঞ্চে একযোগে কাজ করেছে। যৌথ কমিশনের বৈঠকে উভয় দেশ বহুপাক্ষিকতাকে আরো মজবুত করা এবং রাষ্ট্রসংঘকে আরও বেশী প্রতিনিধিত্বমূলক ও কার্যকর করার লক্ষ্যে নিরাপত্তা পরিষদে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। ভারত ও মেক্সিকোর সম্পর্ক এখন কৃষি, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি থেকে শুরু করে জ্বালানি, সংস্কৃতি, শিক্ষা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রসারিত। ভারতীয় সংস্থাগুলি বর্তমানে মেক্সিকোয় সফটওয়ার, ঔষধ সহ একাধিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করছে। টিসিএস, ইনফোসিস, উইপ্রো, এনআইআইটি, এইচসিএল, বিড়লাসফ্ট, অ্যাপটেকের মতো শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় সফ্টওয়্যার সংস্থা এবং ডঃ রেড্ডিজ ল্যাবরেটরিজ, সান ফার্মা, টরেন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো বড় ঔষধ উৎপাদক সংস্থাগুলি মেক্সিকোয় যৌথ উদ্যোগ স্থাপন করেছে।
ভারতীয় সংস্থাগুলি অটোর যন্ত্রাংশ, টায়ার, প্যাকেজিং এবং বৈদ্যুতিক সামগ্রী উত্পাদনেও বিনিয়োগ করেছে। ভারতীয় সংস্থা টরনেল মেক্সিকোতে গাড়ি ও ট্রাকের টায়ার তৈরি করছে। বাজাজ অটো কোম্পানি মেক্সিকোয় দুই চাকা ও তিন চাকার গাড়ীর যন্ত্রাংশ জোড়া ও তার বিপণনের জন্য স্থানীয় সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। অডি ও ভক্সওয়াগেন গাড়ীর যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য পুয়েবলা এবং সান লুইস পেতোসিতে ভারতের সমবর্ধনা মাদারসন গ্রুপ - এসএমপি বিনিয়োগ করেছে।
অন্যদিকে, হোমেক্স, প্রোলিক-জিই, সিনেমাপোলিস, সিমেক্স, নেমাক, সফটেক, মেতাসা সহ বিভিন্ন সংস্থা ভারতে বিনিয়োগ করেছে।
ভারত বিশ্বের দরবারে তার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিকে তুলে ধরার প্রয়াসে মেক্সিকো এবং লাতিন আমেরিকায় তাদের স্থান জোরদার করতে আগ্রহী। এটি ভারত এবং লাতিন আমেরিকার মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক, দার্শনিক এবং বৌদ্ধিক সংযোগ যা ভারত এবং লাতিন আমেরিকার মধ্যে একটি ফলপ্রসূ এবং পারস্পরিক উপযোগী একটি সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করেছে। এ প্রসঙ্গে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের একটি কথা উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেছেন, "সত্যিকারের বন্ধু তিনিই, আপনার হাতটি ধরে যিনি আপনার হৃদয়কে স্পর্শ করেন”।
(মূল রচনা – আশ নারায়ণ রায়)
Comments
Post a Comment