রাজনৈতিক অচলবস্থার পথে পাকিস্তান

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গত সপ্তাহে জাতীয় কমান্ড অ্যান্ড অপারেশন সেন্টার – এনসিওসি’ পক্ষ থেকে দেশব্যাপী রাজনৈতিক সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় তরঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই এই পদক্ষেপ বলে তিনি জানান। ইসলামাবাদ হাইকোর্টও জানায়, কোভিড -১৯ সংক্রান্ত এনসিওসি’র সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন করোনা সংকটকালে বাধ্যতামূলক এবং এর লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে। 

তবে এই নিষেধাজ্ঞার আসল কারণ ১১টি বিরোধী দলের জোট - পিপলস ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট -পিডিএম’এর সরকার বিরোধী বিক্ষোভ পরিকল্পনা বলে মনে করা হচ্ছে। পিডিএম একে করোনার নামে বিরোধী দলের বিক্ষোভকে দমন করার কৌশল আখ্যা দিয়েছে। পিডিএম খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের মানসেহরাতে একটি বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে। পেশোয়ার প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমাবেশ করার অনুমতি না দেওয়া হলেও বিরোধী দলগুলি পিটিআইর শক্ত ঘাঁটি পেশোয়ারে আরেকটি সমাবেশের জোর প্রস্তুতি নিয়েছে। পিডিএম আগামী ২৬শে নভেম্বর লারকানায়, ৩০শে নভেম্বর মুলতান এবং ১৩ই ডিসেম্বর লাহোরেও সমাবেশের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। 

গত সেপ্টেম্বরে গঠনের পর থেকেই পিডিএম পাকিস্তানে রাজনৈতিক শোরগোল সৃষ্টি করেছে এবং সরকার বিরোধী ও প্রতিষ্ঠান বিরোধী বিক্ষোভ এবং ‘জলসা’ বা সমাবেশের আয়োজন করে সরকারকে চাপে রাখছে। নওয়াজ শরীফ দেশের রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল কামার বাজওয়ার নাম প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছেন এবং সমালোচনা করেছেন। এর ফলে সরকার মুখরক্ষার উদ্দেশ্যে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে এবং বলেছে, রাজনৈতিক বিষয়গুলি নিয়ে সংসদেই আলোচনা করা উচিত এবং নেতাদের রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে সেনাবাহিনীর দ্বারস্থ হওয়া উচিত নয়। সেনাবাহিনীর সমালোচনা করার জন্য প্রায়শই দেশ বিরোধী বলে বিবেচিত বালুচ এবং পশতুন নেতাদের সঙ্গে শুধুমাত্র একই মঞ্চে উপস্থিত হওয়াই নয়, পিডিএম তাদের সমস্যাগুলি নিয়েও সোচ্চার হচ্ছে। কোয়েটা সমাবেশে মরিয়ম নওয়াজ সেনাবাহিনী নির্দিষ্ট রেডলাইন অগ্রাহ্য করে বালুচিস্তানের নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন যা পাকিস্তানে প্রায় নিষিদ্ধ একটি বিষয়। 

পিটিআই সরকার পিডিএমকে ভাঙার বহু চেষ্টা করেছে, দেশের প্রধান দুটি বিরোধী দল পিএমএল-এন এবং পিপিপি এক সঙ্গে নেই এবং পিডিএম থেকে বেরিয়ে যেতে পারে বলে গুজব ছড়ানো হয়েছে। মানসেহরা সমাবেশে মরিয়ম নওয়াজ বলেছেন, পিডিএম এই সংগ্রামকে অব্যাহত রাখতে দৃঢ়সংকল্প। তিনি জানিয়েছেন, নওয়াজ শরীফ পাকিস্তানে ফিরবেন এবং চতুর্থবারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হবেন। বিরোধীরা যে আগামী দিনে সরকারের উপর চাপ বাড়াতে দৃঢ়সংকল্প এটা তারই ইঙ্গিত দেয়। 

এদিকে ইমরান খান সরকার আন্তঃসীমান্ত জঙ্গি কার্যকলাপে সমর্থন যোগানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী জম্মু ও কাশ্মীরের নাগরোটায় নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জৈশ-এ-মহম্মদ – জেএম’এর পুলওয়ামার ধাঁচের আরেকটি হামলা বানচাল করে দিয়েছে। অভিযানের সময় পাকিস্তানের চার জেএম জঙ্গি নিহত হয়। ভারতীয় বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে পাকিস্তানের চিহ্নযুক্ত বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ উদ্ধার করে। ভারত এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিককে তলব করে এবং ঐ হামলার অপচেষ্টার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ভারতীয় বাহিনীর সতর্ক পদক্ষেপের ফলেই ঐ হামলা এড়ানো সম্ভব হয়। ভারত, পাকিস্তানকে তাদের ভূমি থেকে সক্রিয় জঙ্গি ও জঙ্গি দলগুলির কার্যকলাপকে সমর্থনের নীতি থেকে বিরত থাকতে এবং জঙ্গিদের ঘাঁটি ও তাদের পরিকাঠামো ধ্বংস করার দাবি জানিয়েছে। 

পাকিস্তান একটি দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করছে। এর পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির দরুণ সাধারণ মানুষ পিডিএমের বিক্ষোভের সঙ্গে সামিল হয়ে পথে নামছে। পিটিআই সরকার অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলির সমাধান করার পরিবর্তে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং একই সঙ্গে সীমান্তে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপকে উত্সাহদানে ব্যস্ত। এদিকে পিডিএম তাদের নির্ধারিত সমাবেশগুলির জন্য প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে এবং ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পদত্যাগের দাবিতে আগামী বছরের জানুয়ারিতে ইসলামাবাদ পর্যন্ত দীর্ঘ পদযাত্রা করার ডাক দিয়েছে। 

পাকিস্তান ক্রমশঃ রাজনৈতিক অচলাবস্থার দিকে এগিয়ে চলেছে। দেশে করোনা সংক্রমণের ঘটনাও বাড়ছে। এই অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার বিষয়ে সেনাবাহিনী কী প্রতিক্রিয়া দেখায় তা দেখার বিষয়। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কি দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার শপথ ভঙ্গ করবে? এই সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না! 

( মূল রচনা – ডঃ জয়নাব আখতার )

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?