ভারত-বাহরিন সম্পর্ক আরও মজবুত হতে চলেছে

ঐতিহাসিক সম্পর্ক, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং জন সম্পর্কের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র বাহরিনের সঙ্গে ভারতের মজবুত বাণিজ্যিক, কৌশলগত ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এই দেশটি আকারে ক্ষুদ্র হলেও, আঞ্চলিক সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাহরিন আরব উপসাগরীয় উন্নয়ন মডেলেরও প্রবর্তক। বাহরিনের সঙ্গে ভারত সবসময় মজবুত কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। পেট্রোলিয়াম ও অন্যান্য পণ্যের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পাশাপাশি এই দেশে প্রায় ৩০০,০০০ প্রবাসী ভারতীয় রয়েছেন যারা অর্থনৈতিক বিকাশে অবদান রেখেছেন এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে আসছেন।


প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শাসনকালে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কগুলি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ২০১৯-এ প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এই দ্বীপরাষ্ট্র সফর করেন। ভারত ও বাহরিনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে মজবুত করার প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসাবে প্রধানমন্ত্রীকে ‘বাহরিন অর্ডারে’ সম্মানিত করেন রাজা হামাদ বিন ইসা আল-খলিফা। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো) এবং বাহরিন জাতীয় মহাকাশ ও বিজ্ঞান সংস্থা (এনএসএসএ) এর মধ্যে সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সৌর জোট (আইএসএ) এর সঙ্গে বাহরিনের সহযোগিতা সহ উভয় পক্ষ চারটি সমঝোতা স্মারক পত্রে স্বাক্ষর করে। এগুলি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করেছে।



ভারত ও বাহরিন কোভিড-১৯ সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রেও অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী শ্রী মোদী এবং রাজা হামাদ ২০২০র এপ্রিল মাসে দূরভাষে আলাপচারিতায় দুই দেশের আধিকারিকদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা এবং কোভিড-১৯ এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একে অপরের সমস্ত সম্ভাব্য সহযোগিতা সুনিশ্চিত করতে সম্মত হ’ন। বাহরিন সেই দেশগুলির মধ্যে অন্যতম দেশ ছিল যাদের কাছে ভারত প্রথম পর্যায়েই কোভিড সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের রফতানি করেছিল।



পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর এস জয়শঙ্কর এই সপ্তাহে বাহরিন সফর শুরু করেন। কোভিড-১৯ অতিমারির ফলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ এবং বিভিন্ন বৈঠক না হয়ে ওঠায় সাম্প্রতিক সময়কালে তিনি যে কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক সফর করেছিলেন বাহরিন সফর তাদের অন্যতম। উলেখযোগ্য বিষয় হ’ল, এটি ডক্টর জয়শঙ্করেরও পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে প্রথম বাহরিন সফর যদিও কূটনীতির দীর্ঘ কর্মজীবনে আরব উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি অপরিচিত ছিলেন না। 



দুই দিনের তাঁর সফরটি বিভিন্ন কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। সমগ্র বিশ্ব যখনকোভিড-১৯ মহামারীর কার্যকর মোকাবিলায় লড়াই চালাচ্ছে, বিভিন্ন দেশে মহামারীর ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি থেকে উঠে আসতে এবং কোভিড পরবর্তী চ্যালেঞ্জের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে তখন এই সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে সহায়তা করবে। বাহরিনের বিদেশ মন্ত্রী ডক্টর আবদুল্লাতিফ বিন রশিদ আল-জায়েনির সঙ্গে আলোচনার সময় উভয় পক্ষ প্রতিরক্ষা ও সমুদ্র সুরক্ষা, মহাকাশ প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পরিকাঠামো, তথ্য প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, হাইড্রোকার্বন এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানী সহ ঐতিহাসিক ভারত-বাহরিন সম্পর্ককে আরও মজবুত করার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। ডক্টর জয়শঙ্কর বাহরিনের বিদেশ মন্ত্রীকে আগামী মাসগুলিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া তৃতীয় ভারত-বাহরিন উচ্চ যৌথ কমিশনের বৈঠকে অংশ নিতে নতুন দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানান।


পরিবর্তিত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনা প্রবাহের মধ্যেই এই সফরটি উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে ভারতকে তার ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্বকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইস্রায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে বাহরিন এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সিদ্ধান্তকে ভারত স্বাগত জানিয়েছে এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ঘটনা। নতুন দিল্লি পরিবর্তিত আঞ্চলিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন এবং আঞ্চলিক সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতার দিশায় এগিয়ে যাওয়াকে সমর্থন করে।



পররাষ্ট্র মন্ত্রী বাহরিনের যুবরাজ সালমান বিন হামাদ আল-খলিফা, সে দেশের উপ-সুপ্রিম কমান্ডার এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা করেন এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী যুবরাজ খলিফা বিন সালমান আল-খলিফার প্রয়ানে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং ভারত-বাহরিন সম্পর্ককে মজবুত করা এবং বাহরিনে ভারতীয় সম্প্রদায়ের কল্যাণে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেন। এই সফরের সময়, পররাষ্ট্র মন্ত্রী বাহরিনে ভারতীয় সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল বৈঠকও করেন এবং মানামায় ২০০ বছরের পুরানো শ্রীনাথজি (শ্রী কৃষ্ণ) মন্দির পরিদর্শন করেন। এই মন্দিরটি আদতে ভারত এবং বাহরিনের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ-জন সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে।


ভারত ও বাহরিন সহস্র বছরের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক, সুরক্ষা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে আবদ্ধ। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য দুই দেশেরই এক অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে এবং ডক্টর জয়শঙ্করের এই সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও বাড়িয়ে তুলবে। এই সফর পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও মজবুত করার পথ সুগম করেছে।


[মূল রচনা- ডক্টর মহম্মদ মুদাসসির কামার]


______________

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?