প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর হওয়া লক্ষ্যে
দেশীয় শিল্পক্ষেত্র থেকে ২৭,০০০ কোটি টাকার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের বিষয়ে প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদ – ডিএসি অনুমোদন দিয়েছে। এই পদক্ষেপ অবশ্যই সরকারের "মেক ইন ইন্ডিয়া" এবং "আত্মনির্ভর ভারত" উদ্যোগকে উত্সাহ দেবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ১২ই মে আত্মনির্ভর ভারত গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন ১৬ই মে পরবর্তী প্রতিরক্ষা-বিষয়ক সংস্কারের ঘোষণা করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি গত ফেব্রুয়ারি মাসে লখনৌএ একাদশ প্রতিরক্ষা এক্সপোর উদ্বোধনে ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানি আগামী ৫ বছরে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলেন। তিনি বেসরকারী বিনিয়োগকারীদের দেশে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানান। এর ফলে দুটি উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব। বিনিয়োগের থেকে যথেষ্ট ভালো ফেরত পাওয়া এবং এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতিকে প্রতিরক্ষা উত্পাদনে স্বাবলম্বী করে তোলা। সরকার যে গুরুত্ব সহকারে প্রতিরক্ষা সংস্কারের চেষ্টা চালাচ্ছে তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই।
এই সংস্কারগুলির লক্ষ্য ভারতের বিশাল প্রতিরক্ষা আমদানির ব্যয় হ্রাস করা। উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তে জটিল প্রতিরক্ষা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার জন্য ব্যয়বহুল অস্ত্র ও প্ল্যাটফর্ম আমদানির জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা দেশের পক্ষে কঠিন হওয়ায় ভারত প্রতিরক্ষা উত্পাদনে স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে।
ডিএসি’র সাম্প্রতিক বৈঠকে অনুমোদিত অধিগ্রহণের প্রস্তাবগুলির মধ্যে রয়েছে - ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্য ডিআরডিও তৈরী এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল – AEW&C সিস্টেম, নৌবাহিনীর জন্য নেক্সট জেনারেশন (GenNext) অফশোর পেট্রোল ভ্যাসেলস এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য মডুলার ব্রিজ। সামরিক সরঞ্জামের জন্য আমদানির উপর নির্ভরশীল দেশ কখনই শক্তিশালী হতে পারে না। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা খাতে স্বাবলম্বী হওয়া দেশের সঙ্গে ‘আত্মসম্মান’ এবং ‘সার্বভৌমত্ব’এর সঙ্গে যুক্ত - ভারতের স্বনির্ভর হওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে এই ভাবনা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ভারতকে "স্বাবলম্বী" করার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য দরজা বন্ধ করা, এর অর্থ হল, দেশে উত্পাদন করার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলির জন্য আরও দরজা উন্মুক্ত হওয়া। এই কথা মনে রেখে ইতিমধ্যেই প্রতিরক্ষা খাতে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ – এফডিআই’এর উর্ধ্বসীমা ৪৯% থেকে বাড়িয়ে ৭৪% করা হয়েছে।
এর আগে, সরকার ২০২৪ সাল পর্যন্ত হালকা যুদ্ধের হেলিকপ্টার, সাবমেরিন এবং ক্রুজ মিসাইল সহ ১০১টি অস্ত্র ও সামরিক প্ল্যাটফর্ম আমদানিতে নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, এই সিদ্ধান্তের ফলে, ভারতে প্রতি বছর ৫২ হাজার কোটি টাকার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উত্পাদন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাচক্রে, ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্র বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালক এবং মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন - জিডিপিতে উত্পাদন ক্ষেত্রের অবদান ১৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৫ শতাংশে পৌঁছতে পারে। এই প্রেক্ষিতে ভারত 'মেক ইন ইন্ডিয়া' কর্মসূচীকে উত্সাহিত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই তামিলনাড়ু এবং উত্তর প্রদেশে দুটি প্রতিরক্ষা শিল্প করিডোরের উদ্বোধন করেছে যা বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতেও সহায়ক হবে।
প্রতিরক্ষা উত্পাদন ক্ষমতা বাড়লে তা কেবল দেশীয় শিল্পের জন্য একটি দুর্দান্ত অর্থনৈতিক সুযোগই আনবে না, দ্রুত বিকাশমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশকে ব্যপক কৌশলগত সুবিধা এনে দেবে। এখন ঐ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন অধ্যবসায় এবং ধৈর্য। দেশীকরণের এই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন গভীর দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন পরিকল্পনা, নিশ্চিত আর্থিক যোগান এবং সরঞ্জামের নকশা, উন্নয়ন এবং উত্পনের জন্য ধৈর্য। এছাড়াও, প্রাথমিক পর্যায়ে যতক্ষণ না উন্নয়ন এবং মূলধনী ব্যয় উঠে না আসছে এবং আর্থিক লাভ না হচ্ছে, স্থানীয় সম্পদ আহরণ যথেষ্ট ব্যয়বহুল হতে পারে। এই কারণেই সর্বাধিক উন্নত দেশগুলিও, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দেশীয়করণ বাছাই ক্ষেত্রে করে থাকে।
এই ক্ষেত্রে, প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত, এই নীতি পর্যায়ক্রমে কার্যকর করা। আমাদের আর্টিলারি বন্দুক, ক্ষেপণাস্ত্র, মাল্টি ব্যারেল রকেট লঞ্চার, র্যাড তৈরির দক্ষতা ইতিমধ্যেই রয়েছে। এর পাশাপাশি ভারতকে সেই ক্ষেত্রগুলিকে চিহ্নিত করতে হবে যেখানে তারা স্বাবলম্বী হতে আগ্রহী। এই সব ক্ষেত্রগুলিতে, ভারতকে প্রয়োজনগুলি চিহ্নিত করতে হবে এবং তারপর ১০ থেকে ১৫ বছরের আর্থিক সংস্থান, নকশা, উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি এবং উত্পাদন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
(মূল রচনা - উত্তম কুমার বিশ্বাস )
Comments
Post a Comment