নেপালে রাজনৈতিক বিপর্যয়

পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর আগে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে,পি,শর্মা ওলির সংসদ ভেঙে দেওয়ার আচমকা প্রস্তাব সে দেশকে এক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। দলের কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দহলের নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী ক্ষমতাসীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির স্বেচ্ছাচারী কাজকর্ম, অপশাসন, কোভিড -১৯ পরিস্থিতির কার্যকর মোকাবিলায় ব্যর্থতা এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছিল। তাঁর মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকের পরে, শ্রী ওলি, রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারীর কাছে প্রতিনিধিসভা ভেঙে দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং ২০২১-এর ৩০শেএপ্রিল এবং ২০ মে সংসদে নতুন নির্বাচন করার আহ্বান জানান এবং রাষ্ট্রপতি সেই প্রস্তাবে তৎক্ষনাত অনুমোদন দেন। মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, দহল ও মাধব নেপাল গোষ্ঠীর সাত মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। সংসদ ভেঙে দেওয়াকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দেশের সুপ্রিম কোর্টে তিনটি আবেদন করা হয়েছে।

শ্রী দহলের নেতৃত্বে প্রায় ৯০ জন ক্ষমতাসীন দলের সদস্য প্রতিনিধিসভায় তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে চলেছেন এমন আশঙ্কার মধ্যেই শ্রী ওলি এই আকস্মিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এই সব সদস্যগণ শ্রী দহলকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সুপারিশ করেন। ক্ষমতাসীন নেপাল কম্যুনিস্ট পার্টির সংসদে মোট ২৭৫ আসনের মধ্যে ১৭৪ সদস্য নিয়ে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। কিন্তু তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠে আসায় শ্রী ওলির কাছে তা আস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এমনই ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে দলের সর্বোচ্চ মঞ্চে, নয় সদস্য সচিবালয়, ৪৪ সদস্যের স্থায়ী কমিটি এবং ৪৪৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিনি সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছেন। তিনি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন এবং এই কমিটি সংসদ ভেঙে দেওয়ার জন্য তাঁর স্বেচ্ছাচারমূলক পদক্ষেপের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে একটি টেলিভিশনে শ্রী ওলি তাঁর পদক্ষেপের সমর্থনে বলেন যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারের প্রধান মন্ত্রীর পদে তাকে কাজ করতে দেওয়া হয়নি এবং তাই নতুন জনাদেশ নিতেই এই সিদ্ধান্ত নেন যা সবথেকে ভালো এক গণতান্ত্রিক বিকল্প। এমনকি তিনি স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেন।

ক্ষমতাসীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি, এনসিপি ২০১৮ সালের মে মাসে শ্রী ওলির নেতৃত্বাধীন তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল (ইউনিফাইড মার্কসবাদী লেনিনবাদী, ইউএমএল) এবং শ্রী দহলের নেতৃত্বাধীন মাওবাদী পার্টির একীকরণের মাধ্যমে গড়ে উঠেছিল। যদিও উভয় দলই এখনও প্রকৃত অর্থে বা গ্রাম উন্নয়ন কমিটির পর্যায়ে পুরোপুরি সমন্বয় সাধন করে উঠতে পারে নি। তারা সম্মিলিতভাবে ২০১৭র ফেডারাল এবং প্রাদেশিক নির্বাচন লড়াই করেছিল এবং সংসদীয় নির্বাচনে ও সাতটি প্রাদেশিক নির্বাচনের মধ্যে ছয়টিতে বিজয়ী হয়েছিল।

২০১৫ সালে নতুন সংবিধান ঘোষণার পরে, ২০১৭ সালে সাধারণ নির্বাচনের সময় কমিউনিস্টরা নেপালি জনগণের কাছে যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা স্বল্পস্থায়ী ছিল। সংসদে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও, ওলি সরকার আন্তঃ দলীয় কোন্দলে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। কমপক্ষে দু'বার, এই বছরের এপ্রিল-মে মাসে এবং আবার আগস্ট-সেপ্টেম্বরেও দল ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, তবে বিদেশি শক্তির অমার্জিত হস্তক্ষেপ শ্রী ওলির পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল। শ্রী ওলি এবং শ্রী প্রচন্ড উভয়ই ২২শে অক্টোবর কাঠমান্ডুতে তাদের সমর্থকদের পৃথক পৃথক সম্মেলন করেছিলেন যাতে এনসিপি যে আসলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে তার ইঙ্গিত দিয়েছিল। 

সংসদ ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বৈধতা এবং ন্যায্যতাকে চ্যালেঞ্জ করা আবেদনের কি হয় সে বিষয়ে সবার নজর এখন দেশের সুপ্রিম কোর্টের দিকে। নেপালের সংবিধান বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই পদক্ষেপকে অসাংবিধানিক বলে মনে করেন কেননা পাঁচ বছরের নির্ধারিত মেয়াদের জন্য থাকা ক্ষমতাধর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সংবিধান অনুযায়ী ছাড়া সরকার ভেঙে দেওয়ার কোনো সংস্থান সেদেশের সংবিধানে নেই। ১৯৯৪ সালের জুন মাসে মনমোহন অধিকারীর নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সিপিএন (ইউএমএল) সরকার সংসদ ভেঙে দেয়। এই সিদ্ধান্তটি চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং সুপ্রিম কোর্ট সংসদ পুনরধিষ্ঠিত করে।

নেপালের পরিস্থিতির ওপর ভারত নজর রাখছে। ভূ-রাজনৈতিকভাবে বন্ধু প্রতিবেশী দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পক্ষে নতুন দিল্লি সর্বদা দাঁড়িয়েছে। ভারত চায় হিমালয়ের কোলে এই দেশের এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাকী অংশেও গণতন্ত্র সমৃদ্ধ হোক।

[মূল রচনা- রতন সালডি]

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?