সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ট সম্পর্ক অব্যহত

পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী একটি আদালত ২৬/১১-র মুম্বাই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হাফিজ সঈদকে সন্ত্রাসে অর্থ যোগান মামলায় ১৫ বছরের কারাদন্ড দিয়েছে। সঈদ ইতিমধ্যেই একাধিক সন্ত্রাসবাদী অর্থ যোগান মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। এই সর্বশেষ শাস্তির মেয়াদকে যুক্ত করলে তার মোট শাস্তির মেয়াদ ৩৬ বছর। ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী কর্মকান্ড বাস্তবায়নের মূলে রয়েছে ৭০ বছর বয়সী সাঈদ। সঈদের জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-এ-তৈবা - এলইটি বছরের পর বছর ধরে জম্মু ও কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালিয়ে এসেছে। সঈদের এই শাস্তির বিষয়টি পুরোপুরিভাবে FATF বা ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। পাকিস্তান "ধূসর তালিকা" থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে তবে এখন পর্যন্ত সফল হয় নি। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এফএটিএফের আসন্ন পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের পরিপ্রেক্ষিতে, পাকিস্তান সন্ত্রাসে অর্থ যোগানকারী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিচ্ছে। পাকিস্তান অতীতে হাফিজ সাঈদের নেতৃত্বাধীন দলগুলিকেও নিষিদ্ধ করেছিল। তবে, এই জাতীয় গোষ্ঠীগুলি বিভিন্ন নামে নতুনভাবে সক্রিয় হয়ে তাদের সাধারণ ঘৃণ্য ক্রিয়াকলাপগুলি আবার শুরু করেছে। 

অন্যদিকে সিন্ধ হাইকোর্ট ড্যানিয়েল পার্ল হত্যা মামলায় পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী একটি আদালতের ২০০২ সালের রায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত জঙ্গি আহমেদ ওমর সঈদ শেখকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দিয়েছে। এর আগে, সিন্ধ হাইকোর্ট মামলায় অসঙ্গতি এবং যথাযথ প্রমাণের অভাবে মৃত্যুদণ্ড করে। আমেরিকান নাগরিক এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরো চিফ পার্লকে অপহরণ ও হত্যার জন্য শেখকে মোশারফ সরকারের সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, পার্লের হত্যার একটি ভিডিও করাচির মার্কিন কনস্যুলেটে পাঠানো হয়েছিল। ওমর শেখের বিষয়ে আদালতের ঐ সর্বশেষ রায়ে বিস্মিত মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রক এটিকে "গভীর উদ্বেগজনক" বলে মন্তব্য করেছে। মার্কিন অসন্তুষ্টির আশঙ্কাতেই ওমর শেখের মুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল। 

২০০১ সালে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন-পাকিস্তান সম্পর্কে বেশ কয়েকবার টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদে গিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে নির্মূল করা একটি বড় ঘটনা ছিল। তবে, কয়েক বছর ধরে উভয়ের মধ্যে সম্পর্কের অচলাবস্থা ক্রমশ কাটছে। সুতরাং, মার্কিন প্রশাসন ওমর শেখের মুক্তি আটকাতে কড়া মনোভাব নেবে কিনা অথবা ঘটনার গতিপ্রকৃতির দিকে লক্ষ্য রেখে সংযত থাকবে সেটাই দেখার বিষয়। 

পাকিস্তান সমর্থিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের কয়েক দশক পুরানো সংগ্রামে হাফিজ সাঈদ এবং শেখ ওমর দু'জনেরই সরাসরি যোগ রয়েছে। সঈদ ভারতের বিরুদ্ধে একাধিক জঙ্গি হামলার মূল হোতা। অন্যদিকে ওমর শেখ আইসি - ৮১৪ বিমান ছিনতাই ও অপহরণের ঘটনায় মুক্তি পাওয়া তিনজন জঙ্গিদের মধ্যে অন্যতম। এই মুক্তির আগে ওমর ভারতীয় কারাগারে বন্দী ছিল। ১৯৯৫ সালে তত্কালীন জম্মু ও কাশ্মীরে বিদেশী পর্যটকদের অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় সে জড়িত ছিল। ওমর শেখ তখন আল-ফারান গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। ৯/১১-এর তদন্তেও তার নাম উঠে এসেছিল। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আক্রমণকারী জঙ্গিদের অর্থের ব্যবস্থা করেছিল বলে মনে করা হয়। এছাড়াও ওমর শেখের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের কারাগারের অভ্যন্তর থেকে প্রতারণামূলক কল করারও অভিযোগ রয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য সে এই কাজটি করেছিল। 

পাকিস্তানের দুটি আদালতের একেবারে বিপরীত ধর্মী দুটি রায়ই সন্ত্রাসবাদের ছদ্মবেশ মোকাবেলায় পাকিস্তানের দ্বিচারী এবং বিভ্রান্তিমূলক মনোভাবের পরিচয় দেয়। এটি রাষ্ট্রনীতির মূল হাতিয়ার হিসাবে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের যোগাযোগকেই প্রতিফলিত করে। তার প্রতিবেশী অঞ্চল ও তার বাইরেও সন্ত্রাস সৃষ্টির লক্ষ্য পূরণে পাকিস্তান, সন্ত্রাসবাদী সংগঠন এবং হাফিজ সঈদ ও ওমর শেখের মতো ব্যক্তিদের লালন-পালন করেছে। পাকিস্তান এখনও এই কার্যকলাপ বন্ধ করতে প্রস্তুত নয়। তারা এই জঙ্গি এবং তাদের জঙ্গি তৎপরতার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। 

(মূল রচনা: প্রিয়ঙ্কা সিং) 

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?