পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা অব্যাহত রয়েছে

পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা ও বৈষম্যমূলক আচরণ একইভাবে অব্যাহত রয়েছে। ১৯৪৭ সালে নতুন দেশ হিসেবে পাকিস্তান অস্তিত্ব লাভের অব্যবহিত পরেই এই আচরণ শুরু হয়েছিল এবং কিন্তু গত শতাব্দীর আশির দশকে তা তীব্রতর হয়ে ওঠে। প্রাথমিকভাবে নৃশংস আচরণ বেশিরভাগ হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন এবং খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে এগুলি শিয়া, আহমদিয়া, মুহাজির, হাজারাস, সেরাইকিস এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী অন্যান্য অনুরূপ সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধেও ছড়িয়ে পড়ে।

এই নৃশংসতা ও বৈষম্যমূলক আচরণ অপহরণ, খুন, গণহত্যা, বলপূর্বক ধর্ম পরিবর্তন, হিংসার হুমকি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ধর্মনিন্দার অভিযোগে হত্যায় রূপান্তরিত হয়েছে। মতাদর্শগতভাবে বিশ্বাসের ভিত্তিই সাধারণভাবে এই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার পিছনে প্রেরণাদায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। আহমদিয়াদের ইতিমধ্যে ধর্মদ্রোহী হিসাবে ঘোষণা করা হলেও পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি জনগোষ্ঠী এবং শিয়া সংখ্যালঘুদের মধ্যে গভীর ধর্মীয় বিভাজন রয়েছে।

নৃশংসতার যে অব্যাহত রয়েছে তার সাম্প্রতিকতম ঘটনায় প্রমাণিত হয় যেখানে বালুচিস্তানে এগারোজন হাজারা কয়লা খননকারীকে সন্ত্রাসবাদীরা চিহ্নিত করে অপহরণের পরে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানে হাজারারা বেশিরভাগই বালুচিস্তান এবং খাইবার-পাখতুনওয়া প্রদেশে বসবাস করেন। এই হাজারারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এমন যুক্তিতেই ইসলামিক স্টেট এই অপহরণ ও হত্যাকন্ড চালায় এবং তারা তার দায় স্বীকার করেছে। তাদের এই সন্দেহের কারণ আসলে পাকিস্তানে হাজারারা ইরানের প্রতি নুগত এবং তারা অধিকাংশই শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। ঘটনাটি আবার বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং বিশ্বব্যাপী এই ঘটনার নিন্দা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বারবার নৃশংসতায় কয়েক হাজার হাজারা পাকিস্তানে নিহত হয়েছেন, কিন্তু পাকিস্তানে এই চলে আসা অপরাধের জন্য কাউকেও বিচারের কাঠগড়ায় তোলা হয় নি।

এদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন যে তিনি হাজরা সম্প্রদায়ের সদস্যদের সাথে দেখা করতে পারছেন না, যারা নিহত ১১ জন খনি শ্রমিককে কবর দিতে অস্বীকার করেছেন। এই হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলেও।

পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বালুচিস্তানের শিয়া হাজারা সম্প্রদায়ের বিক্ষোভকারী সদস্যদের কয়লা খনি অঞ্চলেরই খনি শ্রমিকদের মরদেহ সমাহিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অঙ্গীকার করেন যে খুব শীঘ্রই তিনি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলির সঙ্গে দেখা করবেন। তবে তাঁর এই আশ্বাসে কোনও ফল হয়নি এবং মজলিস-ই-ওয়াহাদাত-ই-মুসালিমীন নামে একটি দলের নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা করাচি ও কোয়েটারের মতো অন্যান্য শহরে সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ শিয়া দ্বারা ব্যবহৃত প্রার্থনাস্থলগুলিতে সুরক্ষা এবং নজরদারি বাড়িয়েছে।

মজলিস-এ-ওহাদাত-ই-মুসালিমীন স্পষ্ট জানিয়েছে যে ইমরান খানকে কোয়েটায় যেতে হবে যেখানে মৃতদেহগুলি রাখা হয়েছে। ঐ স্থলটি প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মজলিস-এ-ওহাদাত-ই-মুসালিমীন হাজারা সম্প্রদায়ের সুরক্ষার জন্য লিখিত অঙ্গীকার চায়। সংস্থাটি তাদের বিক্ষোভকে পাকিস্তানের অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে। এই পদক্ষেপটি ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ সরকারের পক্ষে অবশ্যই সুখকর হবে না কেননা তারা ইতিমধ্যে পাকিস্তানের সম্মিলিত বিরোধী দলের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখোমুখি। বেশ কয়েকটি শিয়া সংগঠনও পাকিস্তান জুড়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এমন ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছে যা তাদের নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করবে।

২০২০ সালের এপ্রিলের পরে এটি হাজারার সম্প্রদায়ের উপর প্রথম বড় আক্রমণ ছিল। ২০২০র এপ্রিল মাসে কোয়েটারের একটি বাজারে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১৮ জনের প্রাণহানি হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন হাজারা সপ্রদায়ভুক্ত। বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী হাজারা সম্প্রদায়ের উপর বহু হামলা করেছে। ইসলামিক স্টেট অবশ্য সর্বশেষ এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। তালিবান ও অন্যান্য সুন্নি চরমপন্থী গোষ্ঠী, বিশেষত লস্কর-এ- ঝাঙ্গভি অতীতে এই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়েছিল। ২০১৩ সালে কোয়েটায় তিনটি বোমা হামলায় ২০০ জন হাজারা সম্প্রদায়ের মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল।

পরিস্থিতি তুলে ধরতে ও এই ধরনের হামলার বিরুদ্ধে প্রচারের জন্য হাজারা পিপলস ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্কের মতো বিভিন্ন প্রচার গোষ্ঠী গঠন করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার হাজারা প্রবাসীরাও অনলাইনে এই প্রতিবাদে যোগ দিয়েছেন। আফগানিস্তানের হাজারা সম্প্রদায়ের নেতা হাজী মোহাম্মদ মোহাকিকও কোয়েটার হাজারাদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন।

হাজারাদের বিরুদ্ধে যে নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তা বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা নথিভুক্ত করেছে।। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে হাজারারা পাকিস্তান সরকারকে তাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কোয়েটায় সেনা মোতায়েন করার কথা বলেছে। বহু হাজারা এমন কি এই দাবিও করেছেন যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বালুচিস্তান এবং খাইবার-পাখতুনখাওয়া প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া উচিত।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের এক “নতুন পাকিস্তান” গড়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত করার এই এক উপযুক্ত সময়। যেভাবে এটি চলছে, তাতে মনে হচ্ছে যে ইমরান খান যে পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন, তাঁর পরিকল্পনাগুলিতে নতুন কিছু নেই।


[মূল রচনা- জে এল কওল জালালি]

Comments

Popular posts from this blog

পাকিস্তানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় আমেরিকার উদ্বেগ

ভারতীয় অর্থনীতি পুনরয়জ্জীবনের দিশায়

হাফিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন – প্রহসন না বাস্তব?